Mountain View
বাড়ছে জলবায়ু উদ্বাস্তু, এলাকা ছাড়ছে দখিনা উপকূলের বাসিন্দারা


প্রকাশ : নভেম্বর ৩০, ২০১৫ , ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ
প্রথম সংবাদ ডেস্ক
সোহানুর রহমান::ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আজ বসতে যাচ্ছে জাতিসংঘ জলবায়ু সংস্থা (কপ)’র ২১তম অধিবেশন। এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশসহ ১৪৭টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অংশ গ্রহণের কথা থাকলেও তিনি তা বাতিল করেছেন। সম্মেলনে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবেন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু।

বাংলাদেশ এবারের সম্মেলনে ৭০ জাতির এলডিসি সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্টগুলোর স্বার্থরক্ষার দায়ভার এবার বাংলাদেশের কাঁধেই বর্তেছে। এ ব্যাপারে বন ও পরিবেশমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে এ হুমকি মোকাবেলায় নেওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নে দেওয়া উন্নত রাষ্ট্রের টাকা ঋণ নয়, অনুদান হিসেবে দেওয়ার অনড় দাবি জানাবে এলডিসি সভাপতি বাংলাদেশ।

প্যারিসে অনুষ্ঠেয় জলবায়ু সম্মেলনকে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দু’হাজারেরও বেশি কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে, বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের কর্মসূচি ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঠেকাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বা জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারে যেন সব দেশ একটা চুক্তিতে সম্মত হয় এই দাবী জানিয়ে গতকাল সকাল ১১টায় নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে বরিশাল নগরীর অশ্বিনী কুমার হলের সামনে ক্লাইমেট মার্চ করেছে অ্যাকশন/২০১৫ ও ব্রিট।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নয়নে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে তারা সেকথা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ডে তুলে ধরে তারা। বক্তারা প্যারিস সম্মেলনে আইনি বাধ্যবাধকতাসম্পন্ন সার্বজনীন চুক্তি প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আদালত গঠন, ‘জলবায়ু বাস্তুচ্যুতদের উন্নত দেশগুলোতে সম্মানজনক অভিবাসনের অধিকার প্রদান, জলবায়ু চুক্তিতে অংশীদারিত্ব, ন্যায্যতা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা, জিসিএফ, অভিযোজন তহবিলসহ অন্যান্য তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা খাতে সব ধরনের ঋণের সুযোগ বন্ধ করা, জলবায়ু তহবিলের ব্যবহারে স্থানীয় জনসংগঠনের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি, ইতোমধ্যে সংঘটিত ক্ষয়-ক্ষতি পূরণের জন্য অতিরিক্ত ‘ক্ষতিপূরণ’ প্রদান এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়-সাধনের মাধ্যমে বাংলাদেশের কণ্ঠ জোরদার করাসহ নয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবীর তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে সেটাকে একটা নির্দিষ্ট লেভেলে আনতে বিশ্ব নেতারা যেন এক সাথে কাজ করেন সেই দাবীও জানাচ্ছে বিক্ষোভকারীরা।

তারা বলছে, কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে যেন বিশ্ব নেতারা দৃষ্টি দেয়। সরকার এবং পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাবে যদি সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে যায়, উপকূলেরই ১৬টি জেলার প্রায় ৪ কোটি মানুষ বাস্তুহারা হতে পারে। বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার মানুষ।

দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী জলবায়ু পরিবর্তনে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে এসব এলাকার কোন কোন অংশ বিরুপ পরিবেশে এক পর্যায়ে তলিয়েও যেতে পারে। সিডর ও আইলার ক্ষতিই এর অন্যতম উদাহরণ বলে মনে করেন পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক সুকুমার বিশ্বাস। তিনি আরো জানান, বরিশালের অধিকাংশ এলাকার ভুগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর চাচ্ছে এ অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষায় সকলের ঐক্যবদ্ধ সহায়তা। এ অঞ্চলের জমির উর্বরতা, কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র জলবায়ু পরিবর্তনের মহা সংকটে পড়েছে।

“ধান-নদী-খাল” এই তিনে বরিশাল প্রবাদ বাক্যটি আজ শুধু প্রবাদ হয়ে আছে। আগে ধান, নদী, খাল নিয়ে বরিশালের মানুষ গর্ববোধ করলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ুর পরিবর্তন, রক্ষণাবেণের অভাব, সংস্কারের অভাব, ভূমিদস্যুতার কারনে আজ আর বরিশালবাসি গর্ব করে বলতে পারছে না বলে মনে করেন বাংলাদেশ মডেল ইয়ূথ পার্লামেন্ট’র উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আক্কাস হোসেন।

তিনি জানান, কয়েক বছরের ব্যবধানে বরিশালের মানচিত্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চিত্র হারিয়ে গেলেও তা রক্ষারর্থে কেউ এগিয়ে আসছে না, কারো কোন মাথা ব্যথা নেই, সকলেই এখন নিজ স্বার্থে ব্যস্ত সময় পার করছে। যার কারনে বরিশাল আজ নিজের ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বরিশাল ধানের জন্য বিখ্যাত। বরিশালের চাল দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি করা হত। কিন্তু বর্তমানে ধান চাষ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে জমি না থাকায় আমদানির উপর নির্ভরশীল হতে হয় বরিশালকে। ভূমিদস্যুতা ও ঘনবসতির কারনে চাষাবাদের জমি দিন দিন কমে যাচ্ছে। কৃষকরা কৃষিকাজ ছেড়ে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে। সংস্কারের অভাবে নদীগুলো আজ হুমকির মুখে পড়ছে। নদীতে পলি পড়ার কারণে নাব্যতার সৃষ্টি হয়েছে। গতিপথ পরিবর্তনের ফলে অকার্যকর হয়ে পড়েছে নদী। নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন, নদীতে বেড়িবাঁধ দিয়ে অবৈধ ইটভাটা নির্মাণ করা হচ্ছে। সংস্কার না করায় নদী আজ নিজ সৌন্দর্য্য হারাতে বসেছে। এক সময় বরিশালের মানুষের নদীপথে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারনা। বরিশালে ৫/৭টি পুকুর আর ২/১টি খাল ছাড়া সব পুকুর আর খাল হারিয়ে যাচ্ছে। এদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলেও বরিশালের চিত্র বদলে যাচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা, প্রতিনিয়ত বাড়ছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারনে বরিশাল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ধান, নদী, খাল। নগর উন্নয়নের জন্য বিসিসি খালগুলো ড্রেন আকারে তৈরী করায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে নগরীতে। খাল দখল ও পুকুর ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুর পরিবর্তন এবং নাগরিকদের সচেতনতার অভাবে বরিশাল আজ নিজ সৌন্দর্য্য হারিয়ে ফেলছে বলে মত পরিবেশ কর্মীদের।

সচেতন নাগরিক কমিটি-সনাকের জেলা সভাপতি শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বরিশালকে বাঁচাতে হলে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে সেখানে দুর্নীতি কম হবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার্থে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলে ইটভাটা, ইটভাটার কালো ধোয়ার জন্য পরিবেশ আজ হুমকির মুখে। বন্যা আসলে তা মোকাবিলা করতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের কথা চিন্তা করে ফসল ফলাতে হবে, কৃষকদের ফসল উৎপাদনে আগ্রহ বাড়াতে হবে এবং কৃষি সামগ্রি দিয়ে সাহায্য করতে হবে। খাল, পুকুর রক্ষার্থে অগ্রণি ভূমিকা রাখতে হবে। বর্তমানে ৫/৭টি পুকুর ও জেল খাল নিয়ে মামলা রয়েছে। এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে, সভা সমাবেশ না করে কিভাবে ফসলি জমি, পুকুর খাল রক্ষা করা যায় তা নিয়ে কাজ করতে হবে। জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ায় দক্ষিণ উপকূলের অনেক মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছে। অনেকে এলাকা ছাড়ছে, আশ্রয় নিচ্ছে বিভাগীয় শহরগুলোতে। এতে বরিশাল বিভাগে জনসংখ্যা না বেড়ে বরং কমছে।

Windräder bei Frankfurt/Oder

জানা যায়, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে দুটি আদমশুমারির মধ্যবর্তী ১০ বছরে অ-উপকূলীয় এলাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল এক দশমিক ৫৬ শতাংশ। আর উপকূলীয় এলাকায় হার ছিল এক দশমিক ২৯ শতাংশ। ২০১১ সালের পঞ্চম আদমশুমারির ফলাফলে এই হার শূন্য শতাংশে পৌঁছায়। সর্বশেষ এই আদমশুমারি অনুযায়ী, বরিশালের ছয় জেলায় (বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠি) জনসংখ্যা ৮১ লাখ ৪৭ হাজার। ২০০১ সালে তা ছিল ৮১ লাখ ৭৪ হাজার। অর্থাৎ মানুষ না বেড়ে উল্টো ২৭ হাজার কমেছে। পঞ্চম আদমশুমারির তথ্যানুযায়ী, দেশে গড় বার্ষিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক দশমিক ৩৪ শতাংশ হলেও বরিশাল বিভাগে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্য শতাংশ। এর পেছনে জলবায়ু-অভিবাসন (মাইগ্রেশন) প্রক্রিয়ার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) এক গবেষণায়দেখাগেছে, অন্য যেকোনো বিভাগের তুলনায় বরিশাল বিভাগের মানুষের মধ্যে এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার প্রবণতা বেশি। এখানকার মানুষ ঢাকা ও চট্টগ্রামে বেশি যাচ্ছে। নিপোর্টের ২০০৬ সালের নগর স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, ঢাকা মহানগর এলাকার বড় বড় বস্তির বাসিন্দাদের ২৩ শতাংশ এসেছে বরিশালের গ্রাম থেকে। বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মোঃ গাউস বলেন, উপকূলের মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে ভাল রাখার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। জলবায়ুর যে পরিবর্তন ঘটছে তা চৈত্রের কালবৈশাখী ঝড় দেখেই বোঝা যায়।

পরিবেশ বিষয়ক উপমন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্যারিসে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই পুনর্বাসন প্রশ্নে উন্নত দেশগুলোর সহায়তার বিষয়ে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান নেবে। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেন সম্মেলনে উন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলায় জরুরি হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ২০১২ সালের মধ্যে তিন হাজার কোটি ডলার দেয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল। কিন্তু উন্নত দেশগুলো সেই প্রতিশ্র“তি রাখেনি। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের পর এ সম্মেলনকে এবার সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে জাপানের কিয়োটায় অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনের পর এবারের ‘প্যারিস কপ-২১’কে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ মনে করছেন বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম এবং জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। কিয়োটা প্রটোকল বাস্তবায়নে এবারের সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্যারিসে প্রোটোকল সাক্ষর করতে যাচ্ছেন।

অন্য দিকে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর ভাষ্য, ক্ষতিপূরণ আদায় এবং দাবি বাস্তবায়নে সোচ্চার থাকতে হবে গণমাধ্যমকেই।



পুরোন সংবাদ দেখুন

প্রকাশকঃ মোহাম্মাদ রাজীব ।
সম্পাদকঃ মোস্তফা জামান (মিলন)
প্রধান নির্বাহী সম্পাদকঃ এ এম জুয়েল ।
মোবাইলঃ ০১৭১১৯৭৯৮৪৩
prothomsangbadbd@gmail.com

অফিসঃ প্রথম সংবাদ ডট কম
এক্সট্রিম আনলক, ফাতেমা সেন্টার
দোকান নং ৩১৪, ৪র্থ তলা (বিবির পুকুর পশ্চিম পাড়)
৫২৩ সদর রোড, বরিশাল - ৮২০০
বাংলাদেশ ।

© প্রথম সংবাদ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করা বেআইনি Design & Developed By: Eng. Zihad Rana
Copy Protected by ENGINEER BD NETWORK