খালেদা জিয়ার শেষ মুহূর্তে তারেক রহমান কি ফিরবেন?
খালেদা জিয়া এখন দেশের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত নাম, তবে তা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা বক্তব্যের জন্য নয়, তাঁর শারীরিক অবস্থা ঘিরে। দেশের শীর্ষ একটি বেসরকারি হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে দিন কাটছে এই তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর। ঘন ঘন রক্তক্ষরণ, লিভার ও কিডনির জটিলতা, পাশাপাশি দীর্ঘদিনের হার্ট ও ডায়াবেটিস সমস্যার কারণে পরিস্থিতি মাঝে মধ্যেই সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। প্রতিটি নতুন রিপোর্টের সঙ্গে সঙ্গে দোলাচলে থাকছে পরিবার এবং রাজনৈতিক অঙ্গন- কখনো হালকা স্বস্তি, কখনো আবার গভীর শংকা।হাসপাতালের ভেতরের করিডরে তাকালে এখন প্রায়ই দেখা যায় দলের শীর্ষ নেতাদের ব্যস্ত আনাগোনা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দিনের বিভিন্ন সময় চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, টিমের খোঁজ নিচ্ছেন এবং বাইরে অপেক্ষমাণ নেতাকর্মীদের কাছে সর্বশেষ অবস্থা তুলে ধরছেন। কোনো কোনো দিন রাত গভীর পর্যন্ত তিনি হাসপাতালে অবস্থান করছেন, পাশে থাকছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ও আইনজীবীরাও। খালেদা জিয়ার কেবিনের বাইরে, নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা নেতাকর্মীদের চোখেমুখে তখন শুধু একটাই প্রশ্ন ম্যাডাম কেমন আছেন?এই পুরো পরিস্থিতির সঙ্গে সমান্তরালে আরেকটি বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ সতেরো বছর ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন তিনি। এত দীর্ঘ সময় পর তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে বহুবার গুঞ্জন উঠলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন কারণ এর কেন্দ্রে রয়েছেন গুরুতর অসুস্থ মা, খালেদা জিয়া। দলীয় বিভিন্ন স্তরের সূত্র বলছে, চলমান শারীরিক সংকটের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত মানসিক চাপও বেড়েছে, আর তাই আগের পরিকল্পনার চেয়ে দ্রুত দেশে ফেরার বিকল্প তিনি এখন সিরিয়াসভাবে বিবেচনা করছেন। আসলে তারেক রহমানের দেশে ফেরা পরিকল্পনার গল্প শুরু হয়েছিল আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে। ডিসেম্বরের শুরুতে সম্ভাব্য তফসিল ঘোষণার আগে বা ঠিক পরে দেশে ফিরে আসার একটি রাজনৈতিক রোডম্যাপ নিয়ে বিএনপি কিছুদিন ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে সৌদি আরবে গিয়ে পবিত্র ওমরাহ পালন, তারপর সরাসরি ঢাকায় আগমন এমন একটি যাত্রাপথ নিয়ে আলোচনা চলছিল ঘনিষ্ঠ মহলে। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় তাঁর বাসভবন সংস্কার, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক কার্যালয়ের সজ্জাসহ বেশ কিছু কাজও অনেকটা শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছেন দলের দায়িত্বশীল নেতারা।কিন্তু সব হিসাব বদলে দেয় খালেদা জিয়ার আকস্মিক শারীরিক অবনতি। চিকিৎসকরা যখন তাঁকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে বর্ণনা করছেন, তখন মাইলের পর মাইল দূরে বসে থাকা একজন সন্তানের জন্য নিজেকে ধরে রাখা কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়। লন্ডন থেকে ভিডিও কলে চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা, দিন-রাত মায়ের রিপোর্ট যাচাই আর প্রার্থনা এই নিয়েই কাটছে তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের বেশির ভাগ সময়। পারিবারিক সূত্র বলছে, পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেলে তিনি যে কোনো সময় সব পরিকল্পনা স্থগিত করে সরাসরি ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।খালেদা জিয়া যে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নন, বরং একটি যুগের প্রতিনিধিত্বকারী চরিত্র এটা বুঝতে খুব বেশি বিশ্লেষণ লাগে না। তাঁর রাজনৈতিক পথচলা, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা ও নানা উত্থান-পতন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। সেই মানুষটিই যখন হাসপাতালের বেডে অসহায়, তখন দলীয় আবেগের পাশাপাশি রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশও নাড়িয়ে দিচ্ছে পুরো দৃশ্যপট। বিএনপির তৃণমূল কর্মীরা মনে করছেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক সংকটই হয়তো শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানকে দেশে ফিরতে বাধ্য করবে এবং সেখান থেকেই শুরু হতে পারে দলের নতুন ধাপের নেতৃত্ব।তবে এই প্রত্যাশার মাঝেও বাস্তবতার দেয়াল মোটেও ছোট নয়। দেশে ফিরলে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন মামলার আইনি জটিলতা, গ্রেপ্তার আশঙ্কা, জামিনের সম্ভাবনা, কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতা সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ জটিল এক সমীকরণ তৈরি করেছে। সরকারিভাবে কেউ কিছু না বললেও ক্ষমতাসীন মহলে থাকা বার্তা খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয় এমন ইঙ্গিত দিচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। অন্যদিকে বিএনপির দাবি, যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের শীর্ষ নেতার দেশে ফেরা এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা উচিত; সেটি অস্বীকার করা হলে সংকট আরও তীব্র হবে।সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে আবারো এসে ঠেকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার কাছে। তাঁর চিকিৎসকরা একদিকে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন, অন্যদিকে বিদেশে নেওয়া,না-নেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন অব্যাহত। বিএনপি অভিযোগ করছে, যথাযথ চিকিৎসার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে; আর সরকারপক্ষ বলছে, আইন ও নিয়মের মধ্যেই যা সম্ভব, তা করা হচ্ছে। এ দুই মেরুর টানাপোড়েনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাস্তবতা হচ্ছে একজন প্রবীণ নেত্রী, যার দেহ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং যার প্রতিটি শ্বাস রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, খালেদা জিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কতটা গভীর। কেউ কোরআন খতমের ছবি দিচ্ছেন, কেউ বা দোয়া মাহফিলের লাইভ করছেন, আবার অনেকেই নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ভুলে গিয়ে শুধুই একজন অসুস্থ মানুষের সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও নানান দেশে সমাবেশ, মানববন্ধন, দোয়া-মাহফিলের আয়োজন করছেন বলে খবর আসছে।খালেদা জিয়া এখন বাংলাদেশের রাজনীতির এক কঠিন বাস্তবতার প্রতীক একদিকে অসুস্থ দেহ, অন্যদিকে অসম্পূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই। তাঁর পাশে দাঁড়াতে, মায়ের হাত ধরতে এবং দলের নেতৃত্বে সামনে থেকে দাঁড়াতে কি এবার সত্যিই দেশে ফিরবেন তারেক রহমান এই প্রশ্নের জবাব এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু এটা নিশ্চিত, আগামী কয়েক সপ্তাহে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা, তারেক রহমানের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত এবং জাতীয় নির্বাচনের ক্যালেন্ডার সব মিলেই বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন মোড়ে দাঁড় করাতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।[1106]