পেঁয়াজের দাম আবারও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ
পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। চলতি মাসের শুরুতে খানিকটা স্বস্তি মিললেও
এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এই
বাজারে প্রতিকেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১০৫ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও
পাওয়া যাচ্ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়। নভেম্বরের শুরুতে সরবরাহ সংকটের অজুহাতে দাম বাড়ে
২০ থেকে ২৫ টাকা। পরে সরকারের সম্ভাব্য আমদানির ঘোষণায় দুই সপ্তাহ ধরে
ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। কিন্তু গত মঙ্গলবার থেকে আবারও উল্টো চিত্র দেখা
যায়-পাইকারি ও খুচরা দুই পর্যায়েই দাম বাড়তে শুরু করে।
বাজারে নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ আসতে শুরু করলেও দাম কমছে না। ফরিদপুর ও
পাবনায় নতুন পেঁয়াজ ওঠায় ক্রেতাদের আশা ছিল বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হবে। কিন্তু
বাস্তবে ঘটছে এর বিপরীত। ক্রেতাদের অভিযোগ-মজুদদার ও ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে
ইচ্ছাকৃতভাবে বাজার গরম রাখা হচ্ছে। তারা বলছেন, “মুড়িকাটা পেঁয়াজ এসেছে, সরবরাহ
বেড়েছে; অথচ দাম কমার পরিবর্তে বাড়ছে-এটা সিন্ডিকেটের কাজ ছাড়া আর কিছু না।”
অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, কৃষক পর্যায়েই দাম বেড়ে গেছে। ফলে মোকাম থেকে উচ্চ দামে পেঁয়াজ আনতে হচ্ছে। খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, “মোকামেই এখন দাম বেশি। মোকাম বাড়লে খাতুনগঞ্জে দাম বাড়াটা স্বাভাবিক।”
তিনি আরও জানান, “ফরিদপুর ও পাবনার দিকে নতুন পেঁয়াজ বাজারে এলেও খাতুনগঞ্জে এখনো সরবরাহ শুরু হয়নি। এখানে পৌঁছাতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।”
দেশব্যাপী অস্থিরতার মধ্যে রাজধানীর খুচরা বাজারেও পেঁয়াজের দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে স্থির রয়েছে তিন সপ্তাহ ধরে। ছোট সাইজের পেঁয়াজ ১০০ টাকা, মাঝারি ১১০ টাকা এবং বড় সাইজ ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম না কমায় নিত্যপণ্যের ঝাঁজে সবচেয়ে বিপাকে নিম্ন–মধ্যবিত্ত মানুষ। মুগদা বাজারে এক গৃহকর্মী রাবেকা খাতুন বলেন, “আমাদের আয় বাড়ে না, কিন্তু বাজারে গেলে প্রতিদিনই নতুন দাম শুনতে হয়। পেঁয়াজ ছাড়া রান্না হয় না, তাই চাইলে চাইলেও কম কিনতে পারি না।”
অন্যদিকে পেঁয়াজের বাজার উত্তপ্ত হলেও রসুন ও আদার দামে তেমন ওঠানামা নেই।
দেশি রসুন ৬৫–৭০ টাকা, চায়না রসুন ১৫০ টাকা, চায়না আদা ১৩০ টাকা এবং কেরালা আদা
১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় বাজার তুলনামূলক
স্থিতিশীল রয়েছে।
বাংলাদেশে দাম বাড়লেও ভারতে চিত্র ভিন্ন। দেশটিতে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে
পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে-বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় চার গুণ
কম। বাংলাদেশ আমদানি বন্ধ রাখায় ভারতীয় রপ্তানিকারকরা বড় বাজার হারিয়ে ক্ষতিতে
পড়েছেন। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে ৭ লাখ ২৪ হাজার টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছিল,
যা তাদের মোট রপ্তানির ৪২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ
কিনেছে মাত্র ১২ হাজার ৯০০ টন, যা অত্যন্ত কম।
সরকার বলছে দেশে কোনো সংকট নেই, এবং কৃষকদের সুরক্ষার জন্য আমদানির চাপ
থাকা সত্ত্বেও অনুমোদন দেওয়া হয়নি। কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো.
জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, “নতুন গ্রীষ্মকালীন জাত বাজারে এসেছে এবং
মুড়িকাটা পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়ছে। তাই দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই।” তবে বাস্তবে
পাইকারি ও খুচরা বাজারে দাম কমার পরিবর্তে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি প্রতি বছর একই সময়ে ঘটে।
মৌসুমের শেষ পর্যায়, সংরক্ষণ সুবিধার অভাব, অতিরিক্ত বৃষ্টি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি,
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং আমদানি বন্ধ থাকার কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট
তৈরি হয়। তারা বলছেন, “সরকারি বাজার তদারকি দুর্বল হলে সিন্ডিকেট শক্তিশালী হয়।
ফলে সরবরাহ বাড়লেও দাম কমানো যায় না।”
অনেকের মতে, হঠাৎ অভিযান বা ঘোষণায় বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা-পাইকারি পর্যায়ে স্বচ্ছতা, মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর
ব্যবস্থা, দ্রুত আমদানির প্রস্তুতি, পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষক–ভোক্তা সরাসরি
সংযোগ নিশ্চিত করা। খুচরা বিক্রেতারাও আশা করছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে মুড়িকাটা
পেঁয়াজ দেশজুড়ে পৌঁছালে দাম কমতে পারে।
পেঁয়াজের দাম সামনে কমবে কিনা তা নির্ভর করছে নতুন পেঁয়াজের পূর্ণ সরবরাহ, বাজার ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের ওপর; অন্যথায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫
পেঁয়াজের দাম আবারও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ
পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। চলতি মাসের শুরুতে খানিকটা স্বস্তি মিললেও
এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এই
বাজারে প্রতিকেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১০৫ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও
পাওয়া যাচ্ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়। নভেম্বরের শুরুতে সরবরাহ সংকটের অজুহাতে দাম বাড়ে
২০ থেকে ২৫ টাকা। পরে সরকারের সম্ভাব্য আমদানির ঘোষণায় দুই সপ্তাহ ধরে
ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। কিন্তু গত মঙ্গলবার থেকে আবারও উল্টো চিত্র দেখা
যায়-পাইকারি ও খুচরা দুই পর্যায়েই দাম বাড়তে শুরু করে।
বাজারে নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ আসতে শুরু করলেও দাম কমছে না। ফরিদপুর ও
পাবনায় নতুন পেঁয়াজ ওঠায় ক্রেতাদের আশা ছিল বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হবে। কিন্তু
বাস্তবে ঘটছে এর বিপরীত। ক্রেতাদের অভিযোগ-মজুদদার ও ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে
ইচ্ছাকৃতভাবে বাজার গরম রাখা হচ্ছে। তারা বলছেন, “মুড়িকাটা পেঁয়াজ এসেছে, সরবরাহ
বেড়েছে; অথচ দাম কমার পরিবর্তে বাড়ছে-এটা সিন্ডিকেটের কাজ ছাড়া আর কিছু না।”
অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, কৃষক পর্যায়েই দাম বেড়ে গেছে। ফলে মোকাম থেকে উচ্চ দামে পেঁয়াজ আনতে হচ্ছে। খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, “মোকামেই এখন দাম বেশি। মোকাম বাড়লে খাতুনগঞ্জে দাম বাড়াটা স্বাভাবিক।”
তিনি আরও জানান, “ফরিদপুর ও পাবনার দিকে নতুন পেঁয়াজ বাজারে এলেও খাতুনগঞ্জে এখনো সরবরাহ শুরু হয়নি। এখানে পৌঁছাতে আরও কয়েকদিন সময় লাগবে।”
দেশব্যাপী অস্থিরতার মধ্যে রাজধানীর খুচরা বাজারেও পেঁয়াজের দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে স্থির রয়েছে তিন সপ্তাহ ধরে। ছোট সাইজের পেঁয়াজ ১০০ টাকা, মাঝারি ১১০ টাকা এবং বড় সাইজ ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম না কমায় নিত্যপণ্যের ঝাঁজে সবচেয়ে বিপাকে নিম্ন–মধ্যবিত্ত মানুষ। মুগদা বাজারে এক গৃহকর্মী রাবেকা খাতুন বলেন, “আমাদের আয় বাড়ে না, কিন্তু বাজারে গেলে প্রতিদিনই নতুন দাম শুনতে হয়। পেঁয়াজ ছাড়া রান্না হয় না, তাই চাইলে চাইলেও কম কিনতে পারি না।”
অন্যদিকে পেঁয়াজের বাজার উত্তপ্ত হলেও রসুন ও আদার দামে তেমন ওঠানামা নেই।
দেশি রসুন ৬৫–৭০ টাকা, চায়না রসুন ১৫০ টাকা, চায়না আদা ১৩০ টাকা এবং কেরালা আদা
১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় বাজার তুলনামূলক
স্থিতিশীল রয়েছে।
বাংলাদেশে দাম বাড়লেও ভারতে চিত্র ভিন্ন। দেশটিতে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে
পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে-বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় চার গুণ
কম। বাংলাদেশ আমদানি বন্ধ রাখায় ভারতীয় রপ্তানিকারকরা বড় বাজার হারিয়ে ক্ষতিতে
পড়েছেন। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশে ৭ লাখ ২৪ হাজার টন পেঁয়াজ রপ্তানি করেছিল,
যা তাদের মোট রপ্তানির ৪২ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ
কিনেছে মাত্র ১২ হাজার ৯০০ টন, যা অত্যন্ত কম।
সরকার বলছে দেশে কোনো সংকট নেই, এবং কৃষকদের সুরক্ষার জন্য আমদানির চাপ
থাকা সত্ত্বেও অনুমোদন দেওয়া হয়নি। কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো.
জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, “নতুন গ্রীষ্মকালীন জাত বাজারে এসেছে এবং
মুড়িকাটা পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়ছে। তাই দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই।” তবে বাস্তবে
পাইকারি ও খুচরা বাজারে দাম কমার পরিবর্তে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি প্রতি বছর একই সময়ে ঘটে।
মৌসুমের শেষ পর্যায়, সংরক্ষণ সুবিধার অভাব, অতিরিক্ত বৃষ্টি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি,
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং আমদানি বন্ধ থাকার কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট
তৈরি হয়। তারা বলছেন, “সরকারি বাজার তদারকি দুর্বল হলে সিন্ডিকেট শক্তিশালী হয়।
ফলে সরবরাহ বাড়লেও দাম কমানো যায় না।”
অনেকের মতে, হঠাৎ অভিযান বা ঘোষণায় বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা-পাইকারি পর্যায়ে স্বচ্ছতা, মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর
ব্যবস্থা, দ্রুত আমদানির প্রস্তুতি, পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষক–ভোক্তা সরাসরি
সংযোগ নিশ্চিত করা। খুচরা বিক্রেতারাও আশা করছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে মুড়িকাটা
পেঁয়াজ দেশজুড়ে পৌঁছালে দাম কমতে পারে।
পেঁয়াজের দাম সামনে কমবে কিনা তা নির্ভর করছে নতুন পেঁয়াজের পূর্ণ সরবরাহ, বাজার ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের ওপর; অন্যথায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন