মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে বাবরি মসজিদ–ধাঁচের একটি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শনিবার উত্তেজনা ছড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে স্থগিত হওয়া ভরতপুরের MLA হুমায়ুন কবীর পূর্বঘোষণা অনুযায়ী এই বিশেষ কর্মসূচি আয়োজন করেন, যা সকাল থেকেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। দুপুর নাগাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন হুমায়ুন কবীর। তাঁর দাবি ছিল, বাবরি মসজিদ প্রকল্পকে ঘিরে কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হবে। সৌদি আরবের দুই ধর্মগুরুসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মীয় নেতারাও উপস্থিত থাকবেন বলে আগেই জানিয়েছিলেন তিনি।
এদিন সকাল থেকেই এলাকাজুড়ে বড় আকারের প্রস্তুতি চোখে পড়ে। কবীরের ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, প্রায় ৪০ হাজার অতিথির খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও আলাদা ২০ হাজার প্যাকেট প্রস্তুত ছিল। শুধু খাদ্য ব্যয়ই ছাড়িয়েছে ৩০ লাখ রুপি, আর পুরো আয়োজনের মোট বাজেট ৭০ লাখেরও বেশি। ভিড় নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৩,০০০ স্বেচ্ছাসেবী মোতায়েন করা হয়। মোরাদিঘির কাছে ২৫ বিঘা জমির ওপর পুরো এলাকা কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে পরিণত হয়। NH-12–এ যাতে কোনো ধরনের জট বা অশান্তি না হয়, তা নিশ্চিত করতে দাঙ্গা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী টহল দেয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে বিজেপির পক্ষ থেকে। বিজেপি নেতা অর্জুন সিং সরাসরি হুমায়ুন কবীরকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “তিনি যদি বাবরি মসজিদ বানানোর চেষ্টা করেন, তবে বাবরের কাছেই তাঁকে পাঠানো হবে।” তাঁর অভিযোগ, ভারত একটি হিন্দু–অধ্যুষিত দেশ, আর এখানে “বাবরি” নাম ব্যবহার করা সংবিধানের প্রতি ‘অসম্মান’।
বিজেপি আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্যও অভিযোগ করেন, পুরো অনুষ্ঠানটি ধর্মীয় নয়; বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে “আবেগ উসকে দেওয়ার প্রকল্প”। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের কথায়, “রাম মন্দির তৈরি হয়ে গেছে, এখন বাবরি মসজিদ ভুলে যাওয়ার সময় এসেছে।”
এই তীব্র সমালোচনার মধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেস হুমায়ুন কবীরকে দল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে। কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম জানান, “হুমায়ুন কবীরকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তৃণমূল ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাস করে।” দলটির দাবি-কবীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করছেন, এবং তিনি আসলে বিজেপির “গোপন এজেন্ট”, যার উদ্দেশ্য রাজ্যে উত্তেজনা বাড়ানো।
দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর কবীর আরও আগ্রাসী অবস্থান নেন। ঘোষণা করেন, ১৭ ডিসেম্বর তিনি MLA পদ থেকে ইস্তফা দেবেন এবং ২২ ডিসেম্বর নতুন দল গঠন করবেন। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টির মধ্যে ১৩৫ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথাও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, “মাত্র তিন কাঠা জায়গায় বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছি। ২৫ বিঘা জমিতে তৈরি হবে হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও পার্ক। রাজ্য সরকারের টাকায় বাবরি মসজিদ বানাব না, এতে মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট হয়।”
অন্যদিকে আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনও সতর্কতার সঙ্গে নজরদারি চালায়। যদিও কলকাতা হাই কোর্ট এই বিষয়ে হস্তক্ষেপে অস্বীকৃতি জানায়, তবে রাজ্য সরকারকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশ দেয়।
মুর্শিদাবাদে মুসলিম জনসংখ্যা ৬৭ শতাংশ, এ কারণে এলাকা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। কয়েক মাস আগেই ওয়াকফ বিলকে কেন্দ্র করে সেখানে সহিংসতায় পাঁচজনের প্রাণহানি হয়েছিল। ফলে বাবরি মসজিদ–ধাঁচের মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫
মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে বাবরি মসজিদ–ধাঁচের একটি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শনিবার উত্তেজনা ছড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে স্থগিত হওয়া ভরতপুরের MLA হুমায়ুন কবীর পূর্বঘোষণা অনুযায়ী এই বিশেষ কর্মসূচি আয়োজন করেন, যা সকাল থেকেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। দুপুর নাগাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন হুমায়ুন কবীর। তাঁর দাবি ছিল, বাবরি মসজিদ প্রকল্পকে ঘিরে কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হবে। সৌদি আরবের দুই ধর্মগুরুসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধর্মীয় নেতারাও উপস্থিত থাকবেন বলে আগেই জানিয়েছিলেন তিনি।
এদিন সকাল থেকেই এলাকাজুড়ে বড় আকারের প্রস্তুতি চোখে পড়ে। কবীরের ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, প্রায় ৪০ হাজার অতিথির খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও আলাদা ২০ হাজার প্যাকেট প্রস্তুত ছিল। শুধু খাদ্য ব্যয়ই ছাড়িয়েছে ৩০ লাখ রুপি, আর পুরো আয়োজনের মোট বাজেট ৭০ লাখেরও বেশি। ভিড় নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৩,০০০ স্বেচ্ছাসেবী মোতায়েন করা হয়। মোরাদিঘির কাছে ২৫ বিঘা জমির ওপর পুরো এলাকা কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে পরিণত হয়। NH-12–এ যাতে কোনো ধরনের জট বা অশান্তি না হয়, তা নিশ্চিত করতে দাঙ্গা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী টহল দেয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে বিজেপির পক্ষ থেকে। বিজেপি নেতা অর্জুন সিং সরাসরি হুমায়ুন কবীরকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “তিনি যদি বাবরি মসজিদ বানানোর চেষ্টা করেন, তবে বাবরের কাছেই তাঁকে পাঠানো হবে।” তাঁর অভিযোগ, ভারত একটি হিন্দু–অধ্যুষিত দেশ, আর এখানে “বাবরি” নাম ব্যবহার করা সংবিধানের প্রতি ‘অসম্মান’।
বিজেপি আইটি সেলের প্রধান অমিত মালব্যও অভিযোগ করেন, পুরো অনুষ্ঠানটি ধর্মীয় নয়; বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে “আবেগ উসকে দেওয়ার প্রকল্প”। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের কথায়, “রাম মন্দির তৈরি হয়ে গেছে, এখন বাবরি মসজিদ ভুলে যাওয়ার সময় এসেছে।”
এই তীব্র সমালোচনার মধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেস হুমায়ুন কবীরকে দল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে। কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম জানান, “হুমায়ুন কবীরকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। তৃণমূল ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে বিশ্বাস করে।” দলটির দাবি-কবীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজ করছেন, এবং তিনি আসলে বিজেপির “গোপন এজেন্ট”, যার উদ্দেশ্য রাজ্যে উত্তেজনা বাড়ানো।
দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর কবীর আরও আগ্রাসী অবস্থান নেন। ঘোষণা করেন, ১৭ ডিসেম্বর তিনি MLA পদ থেকে ইস্তফা দেবেন এবং ২২ ডিসেম্বর নতুন দল গঠন করবেন। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টির মধ্যে ১৩৫ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথাও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, “মাত্র তিন কাঠা জায়গায় বাবরি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছি। ২৫ বিঘা জমিতে তৈরি হবে হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও পার্ক। রাজ্য সরকারের টাকায় বাবরি মসজিদ বানাব না, এতে মসজিদের পবিত্রতা নষ্ট হয়।”
অন্যদিকে আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনও সতর্কতার সঙ্গে নজরদারি চালায়। যদিও কলকাতা হাই কোর্ট এই বিষয়ে হস্তক্ষেপে অস্বীকৃতি জানায়, তবে রাজ্য সরকারকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশ দেয়।
মুর্শিদাবাদে মুসলিম জনসংখ্যা ৬৭ শতাংশ, এ কারণে এলাকা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। কয়েক মাস আগেই ওয়াকফ বিলকে কেন্দ্র করে সেখানে সহিংসতায় পাঁচজনের প্রাণহানি হয়েছিল। ফলে বাবরি মসজিদ–ধাঁচের মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
[1188]
রেজিনগরে বাবরি মসজিদ–ধাঁচের মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠান পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে আরও একবার অস্থির করে তুলেছে। হুমায়ুন কবীরের ব্যক্তিগত উদ্যোগ, বিজেপির তীব্র বিরোধিতা এবং তৃণমূলের দূরত্ব, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করছে। প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখলেও রাজনৈতিক তপ্ততা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন