দাঁতের সমস্যায় ভোগেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। ব্যথা, শিরশিরানি, সংবেদনশীলতা, এসব যেন জীবনের একধরনের নিয়মিত সঙ্গী। অথচ বেশির ভাগ মানুষই দাঁত ভালো থাকার গুরুত্ব ঠিকমতো বোঝেন না। ব্যথা না থাকলেই ধরে নেন, সবকিছু ঠিক আছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, অবহেলা বা ভুল খাদ্যাভ্যাসের কারণেই অজান্তেই বাড়তে থাকে দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির প্রদাহ বা ক্যাভিটি।
‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেল্থ’-এর গবেষণায় দেখা যায়, দেশের ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে ৬২ শতাংশ মানুষের দাঁত–সংক্রান্ত কোনো না কোনো রোগ রয়েছে। শিশু–কিশোরদের মধ্যেও এই হার প্রায় সমান। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের প্রতিদিনের খাবারের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দাঁতের সবচেয়ে বড় শত্রু, অতিরিক্ত চিনি, অ্যাসিডযুক্ত পানীয় ও আঠালো স্ন্যাকস।
দন্ত–বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, খাবারের মধ্যে থাকা চিনি মুখে জমে থেকে ব্যাকটেরিয়া তৈরি করে। সেই ব্যাকটেরিয়া অ্যাসিড নিঃসরণ করে দাঁতের উপরিভাগের এনামেল ক্ষয় করে দেয়। এনামেল দুর্বল হয়ে গেলে দাঁতের সংবেদনশীলতা বেড়ে যায়, দেখা দেয় ব্যথা বা গর্ত। তাই কোন খাবার দাঁতের জন্য ক্ষতিকর এবং কোনগুলো সীমিত করা জরুরি, তা জানা খুবই প্রয়োজন।
দাঁতের ক্ষয় ঘটায় যে পাঁচ খাবার
১. আঠালো মিষ্টি: ক্যাভিটির লুকানো কারিগর
চকোলেট, লজেন্স, জেলি, কিশমিশ, শুকনো খেজুর, এসব খাবারের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। এগুলো দাঁতে লেগে থাকে এবং দীর্ঘক্ষণ মুখে আটকে থাকায় ব্যাকটেরিয়ার কাজ আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুকনো ফলে থাকা প্রাকৃতিক চিনি অত্যন্ত ঘন আকারে থাকে। দাঁতে আটকে থাকা এসব খাদ্যকণা থেকে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের এনামেলকে ক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
নিউইয়র্কের দন্ত–চিকিৎসক সন্দীপ সাচার বলেন, “অনেকেই মনে করেন শুকনো ফল খুব স্বাস্থ্যকর। কিন্তু এগুলো দাঁতের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর খাবারের মধ্যে একটি। নিয়মিত খেলে ক্যাভিটি হওয়ার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।”
এমনকি স্বাস্থ্যকর ভেবে খাওয়া নানা হেলথ–বার, ডেট–বার কিংবা বাদামের মিক্সেও থাকে উচ্চমাত্রার আঠালো চিনি, যা দাঁত ক্ষয়ের বড় কারণ।
২. প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস: লুকানো শর্করা দাঁতে প্লাক জমায়
দৈনন্দিন জীবনে সাদা পাউরুটি, মিষ্টি বান, বিস্কুট, কুকিজ, চিপস বা ক্র্যাকার, এসবের ব্যবহার খুবই সাধারণ। কিন্তু দন্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব খাবার সবচেয়ে দ্রুত প্লাক তৈরি করে। শর্করা ভেঙে যখন দাঁতে লেগে থাকে, তখন ব্যাকটেরিয়া সেটিকে অ্যাসিডে রূপান্তর করে।
এ কারণে নিয়মিত প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস খেলে দাঁতের গর্ত, মাড়ির রোগ এবং দাঁতের রঙ পরিবর্তনের প্রবণতা বাড়ে। তাছাড়া এসব খাবার মুখে খুব দ্রুত ভেঙে আঠালো হয়ে দাঁতের গোড়ায় আটকে থাকে, যা পরিষ্কার করাও কঠিন।
অনেকে সকালের নাশতায় বা শিশুদের টিফিনে নিয়মিত বিস্কুট–পাউরুটি দেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এটি মাড়ির রোগ বাড়ানোর অন্যতম কারণ।
৩. কার্বোনেটেড ও প্রস্তুত পানীয়: এনামেলের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক
ডায়েট সোডা, প্যাকেটজাত ফলের রস, স্পোর্টস ড্রিঙ্ক, এনার্জি ড্রিঙ্ক, সব ধরনের কার্বোনেটেড পানীয়তে থাকে উচ্চমাত্রার অ্যাসিড ও কৃত্রিম চিনি। এসব পানীয় দাঁতের এনামেল ধীরে ধীরে ক্ষয় করে।
কার্বোনেটেড পানীয়ের অ্যাসিড দাঁতের সুরক্ষাবর্মকে দুর্বল করে ফেলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনে এক গ্লাস সোডাও দাঁতের উপর ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে।
জিমের পরে প্রোটিন শেক বা এনার্জি ড্রিঙ্ক পান করার অভ্যাসও বিপজ্জনক। এতে থাকা কৃত্রিম সুইটনারও দাঁতের ক্ষতি করতে পারে। অনেকেই মনে করেন “ডায়েট সোডা তো চিনি–বিহীন, তাই ক্ষতি কম।” কিন্তু দন্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাসিড–যুক্ত পানীয় চিনি না থাকলেও এনামেল ক্ষয় করে।
ফলে মুখের স্বাস্থ্য রক্ষায় এসব পানীয় কমানো ছাড়া বিকল্প নেই। কারণ দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে দাঁত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং মাড়ির প্রদাহ দেখা দেয়।
৪. মিষ্টিজাতীয় খাবার: মুখের ব্যাকটেরিয়ার উর্বর ক্ষেত্র
আইসক্রিম, ফ্লেভারড দই, ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল, হেলথ ড্রিঙ্ক, এগুলোকে অনেক সময়ই স্বাস্থ্যকর মনে করা হয়। কিন্তু এগুলোতে থাকে অত্যধিক চিনি, যা দাঁতের জন্য ক্ষতিকর।
সিরিয়াল বা ফ্লেভারড দইয়ের গুঁটিকয়েক চামচের মধ্যেই ১৫–২০ গ্রামের মতো চিনি থাকে, যা মুখের ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। শিশুরা নিয়মিত এসব খাবার খেলে খুব অল্প বয়সেই ক্যাভিটি তৈরি হয়।
এ ধরনের খাবার খেয়ে যদি সঙ্গে সঙ্গে পানি না পান করা হয় বা দাঁত না মাজা হয়, তবে দাঁতে ব্যথা ও শিরশিরানি বাড়তে পারে। মুখের ভিতর আর্দ্র পরিবেশে চিনি দীর্ঘসময় থেকে গেলে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত সক্রিয় হয়, যা দাঁতের সবচেয়ে বড় শত্রু।
৫. টমেটো কেচাপ ও প্রোটিন বার: লুকানো চিনি আপনার অজান্তেই ক্ষতি করছে
অনেকের ধারণা, কেচাপে ভিটামিন আছে, তাই ক্ষতি কম। কিন্তু এক টেবিল চামচ কেচাপেই থাকে প্রায় ৪ গ্রাম চিনি। নিয়মিত কেচাপ খাওয়ার ফলে দাঁতে প্লাক জমে যায় এবং এনামেল দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রোটিন বার আরও ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ব্র্যান্ডের প্রোটিন বারে থাকে ২৫–৩০ গ্রাম পর্যন্ত চিনি, যা একটি ক্যান্ডি বারের থেকেও বেশি। ফলে এগুলো স্বাস্থ্যকর ভাবা হলেও দাঁতের ক্ষতি করে প্রচণ্ডভাবে।
দন্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, কেচাপ বা প্রোটিন বার নিয়মিত খেলে শিশু–কিশোরদের দাঁতে স্থায়ী গর্ত তৈরি হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। কারণ এগুলো মুখের ভেতর আঠালো হয়ে থাকে এবং বারবার অ্যাসিড তৈরি হয়।
এসব খাবার দীর্ঘমেয়াদে দাঁত দুর্বল করে দেয় এবং মাড়ির প্রদাহ বাড়ায়।
ক্যাভিটি এড়াতে করণীয়
দাঁতের ক্ষয় বা ক্যাভিটি একটি প্রতিরোধযোগ্য সমস্যা। কিছু সহজ নিয়ম পালন করলেই মুখের স্বাস্থ্য অনেকটাই ভালো রাখা সম্ভব।
- প্রতিদিন দুইবার দাঁত ব্রাশ করা
- প্রতিবার খাবারের পরে কুলি করা
- চিনি ও আঠালো খাবার কমানো
- কার্বোনেটেড পানীয় সীমিত করা
- বছরে অন্তত দুবার ডেন্টিস্টের চেকআপ
দন্ত–বিশেষজ্ঞদের মতে, দাঁতে ব্যথা, রক্তপাত, মাড়ির ফোলা বা ঠান্ডা–গরমে শিরশিরানি, এসব উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।
দৈনন্দিন যে খাবারগুলো আমরা সবচেয়ে বেশি খাই, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে দাঁতের বড় ক্ষতির কারণ। আঠালো মিষ্টি, প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস, কার্বোনেটেড পানীয়, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও কেচাপ–প্রোটিন বার, সবকটিই দাঁতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সঠিক সচেতনতা ও খাদ্যাভ্যাস বদলালে দাঁতের ক্ষয়, ক্যাভিটি ও মাড়ির রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
অবহেলা নয়, স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই পারে দীর্ঘদিন সুস্থ দাঁত রাখতে সাহায্য করতে।
আপনার মতামত লিখুন