বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন, সুন্দরবন। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলায় ছড়িয়ে থাকা এই বন যেন প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। ঘন সবুজ গাছপালা, নদী-খাল-খাড়ির জাল আর বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণে সাজানো এ বন বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বনে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও প্রতি বছরের মতো এবারও ১ সেপ্টেম্বর খুলে দেওয়া হয়েছে সুন্দরবনের দুয়ার। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবহাওয়া আরামদায়ক থাকে, নদীর জল শান্ত থাকে, ফলে ভ্রমণ হয় স্বাচ্ছন্দ্যে।
সুন্দরবনে ভ্রমণের প্রথম ধাপ হলো ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়া। বাস বা ট্রেনে সরাসরি খুলনা পৌঁছানো যায়। নন-এসি বাস ভাড়া ৬৫০–৮০০ টাকা, এসি বাসে ৭৫০–১৪০০ টাকা পর্যন্ত। চাইলে ট্রেনে করেও খুলনায় পৌঁছানো যায়। খুলনা ছাড়াও বাগেরহাটের মোংলা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকেও সুন্দরবনে যাত্রা শুরু করা যায়। তবে লঞ্চ বা জাহাজে ভ্রমণ করতে চাইলে খুলনা ও মোংলা থেকে যাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক।
সুন্দরবন ভ্রমণের মূল আকর্ষণ হলো নৌভ্রমণ। খুলনা থেকে প্রায় ৬০টির মতো জলযান নিয়মিত ভ্রমণকারীদের সেবা দেয়। ছোট ট্রলার থেকে শুরু করে বড় লঞ্চ বা আধুনিক ক্রুজ—সবই পাওয়া যায়।
এক দিনের ভ্রমণ: ট্রলার ভাড়া ৩–৫ হাজার টাকা।
তিন দিন–দুই রাতের ভ্রমণ: নন-এসি জলযানে জনপ্রতি খরচ ৮–১২ হাজার টাকা।
বিলাসবহুল এসি জলযান: জনপ্রতি ১৪–২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাগে।
এই খরচের ভেতরে সাধারণত অনুমতিপত্র, থাকা-খাওয়া, গাইড, নিরাপত্তা ও অন্যান্য খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
সুন্দরবনের ভেতরে কোনো হোটেল নেই। ভ্রমণকারীদের থাকতে হয় লঞ্চ বা ট্রলারে। সেখানেই চলে রান্নাবান্না ও খাওয়াদাওয়া। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খুলনার দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ও বাণীশান্তা এলাকায় বেশ কিছু ইকো কটেজ তৈরি হয়েছে। অনেক পর্যটক সেখানে থেকেও সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করেন।
সুন্দরবনের প্রতিটি অংশেই লুকিয়ে আছে বিস্ময়। তবে সব জায়গায় প্রবেশের অনুমতি মেলে না। জনপ্রিয় কয়েকটি পর্যটন স্পট হলো—
করমজল ও হাড়বাড়িয়া: মোংলার কাছেই অবস্থিত। করমজলে আছে হরিণ ও কুমিরের প্রজনন কেন্দ্র। হাড়বাড়িয়ার কাঠের ট্রেইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় পদ্মপুকুর আর ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখা মেলে ঘন জঙ্গলের রূপ।
কটকা ও কটকা সৈকত: এখানে সহজেই দেখা মেলে হরিণের পাল। সৈকতে আছে অসংখ্য লাল কাঁকড়া ও বঙ্গোপসাগরের বিশালতা।
দুবলার চর: রাসমেলার জন্য প্রসিদ্ধ এই দ্বীপে প্রতি বছর হাজারো মানুষ আসেন পূণ্যস্নানের জন্য। এখানে জেলেরা শুটকি তৈরি করেন।
হিরণ পয়েন্ট: সংরক্ষিত অভয়ারণ্য। কাঠের রাস্তা ধরে হেঁটে গেলে দেখা মেলে হরিণ, বানর ও নানা প্রজাতির পাখি। ভাগ্য ভালো হলে সামনে দাঁড়িয়ে যেতে পারে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও।
সুন্দরবন শুধু ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি লাখো প্রাণীর আবাসস্থল। তাই কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি—
সুন্দরবনে যাত্রা মানেই লোকালয় থেকে অনেক দূরে থাকা। তাই সঙ্গে রাখতে হবে প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট, চার্জার, শীতকালে ভারী পোশাক। মোবাইল নেটওয়ার্ক সীমিত হলেও তুলনামূলকভাবে টেলিটকের নেটওয়ার্ক বেশি কার্যকর।
বিস্ময়, ভয় আর মায়াবী আকর্ষণ
সুন্দরবনের নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রহস্যময় প্রাকৃতিক ছবি। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ডলফিন, অসংখ্য পাখি, কুমির কিংবা হরিণ, সব মিলিয়ে এ বন যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে এখানে আছে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাখি।
শহরের কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে যখন দাঁড়িয়ে থাকবেন সুন্দরবনের গহিনে, তখন বুঝবেন প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার অনুভূতি কাকে বলে। শুধু চোখে নয়, মনে রয়ে যাবে আজীবন।

মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন, সুন্দরবন। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলায় ছড়িয়ে থাকা এই বন যেন প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। ঘন সবুজ গাছপালা, নদী-খাল-খাড়ির জাল আর বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণে সাজানো এ বন বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বনে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও প্রতি বছরের মতো এবারও ১ সেপ্টেম্বর খুলে দেওয়া হয়েছে সুন্দরবনের দুয়ার। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আবহাওয়া আরামদায়ক থাকে, নদীর জল শান্ত থাকে, ফলে ভ্রমণ হয় স্বাচ্ছন্দ্যে।
সুন্দরবনে ভ্রমণের প্রথম ধাপ হলো ঢাকা থেকে খুলনা যাওয়া। বাস বা ট্রেনে সরাসরি খুলনা পৌঁছানো যায়। নন-এসি বাস ভাড়া ৬৫০–৮০০ টাকা, এসি বাসে ৭৫০–১৪০০ টাকা পর্যন্ত। চাইলে ট্রেনে করেও খুলনায় পৌঁছানো যায়। খুলনা ছাড়াও বাগেরহাটের মোংলা ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকেও সুন্দরবনে যাত্রা শুরু করা যায়। তবে লঞ্চ বা জাহাজে ভ্রমণ করতে চাইলে খুলনা ও মোংলা থেকে যাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক।
সুন্দরবন ভ্রমণের মূল আকর্ষণ হলো নৌভ্রমণ। খুলনা থেকে প্রায় ৬০টির মতো জলযান নিয়মিত ভ্রমণকারীদের সেবা দেয়। ছোট ট্রলার থেকে শুরু করে বড় লঞ্চ বা আধুনিক ক্রুজ—সবই পাওয়া যায়।
এক দিনের ভ্রমণ: ট্রলার ভাড়া ৩–৫ হাজার টাকা।
তিন দিন–দুই রাতের ভ্রমণ: নন-এসি জলযানে জনপ্রতি খরচ ৮–১২ হাজার টাকা।
বিলাসবহুল এসি জলযান: জনপ্রতি ১৪–২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাগে।
এই খরচের ভেতরে সাধারণত অনুমতিপত্র, থাকা-খাওয়া, গাইড, নিরাপত্তা ও অন্যান্য খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
সুন্দরবনের ভেতরে কোনো হোটেল নেই। ভ্রমণকারীদের থাকতে হয় লঞ্চ বা ট্রলারে। সেখানেই চলে রান্নাবান্না ও খাওয়াদাওয়া। তবে সাম্প্রতিক সময়ে খুলনার দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ও বাণীশান্তা এলাকায় বেশ কিছু ইকো কটেজ তৈরি হয়েছে। অনেক পর্যটক সেখানে থেকেও সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করেন।
সুন্দরবনের প্রতিটি অংশেই লুকিয়ে আছে বিস্ময়। তবে সব জায়গায় প্রবেশের অনুমতি মেলে না। জনপ্রিয় কয়েকটি পর্যটন স্পট হলো—
করমজল ও হাড়বাড়িয়া: মোংলার কাছেই অবস্থিত। করমজলে আছে হরিণ ও কুমিরের প্রজনন কেন্দ্র। হাড়বাড়িয়ার কাঠের ট্রেইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখা যায় পদ্মপুকুর আর ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখা মেলে ঘন জঙ্গলের রূপ।
কটকা ও কটকা সৈকত: এখানে সহজেই দেখা মেলে হরিণের পাল। সৈকতে আছে অসংখ্য লাল কাঁকড়া ও বঙ্গোপসাগরের বিশালতা।
দুবলার চর: রাসমেলার জন্য প্রসিদ্ধ এই দ্বীপে প্রতি বছর হাজারো মানুষ আসেন পূণ্যস্নানের জন্য। এখানে জেলেরা শুটকি তৈরি করেন।
হিরণ পয়েন্ট: সংরক্ষিত অভয়ারণ্য। কাঠের রাস্তা ধরে হেঁটে গেলে দেখা মেলে হরিণ, বানর ও নানা প্রজাতির পাখি। ভাগ্য ভালো হলে সামনে দাঁড়িয়ে যেতে পারে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও।
সুন্দরবন শুধু ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি লাখো প্রাণীর আবাসস্থল। তাই কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি—
সুন্দরবনে যাত্রা মানেই লোকালয় থেকে অনেক দূরে থাকা। তাই সঙ্গে রাখতে হবে প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট, চার্জার, শীতকালে ভারী পোশাক। মোবাইল নেটওয়ার্ক সীমিত হলেও তুলনামূলকভাবে টেলিটকের নেটওয়ার্ক বেশি কার্যকর।
বিস্ময়, ভয় আর মায়াবী আকর্ষণ
সুন্দরবনের নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রহস্যময় প্রাকৃতিক ছবি। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ডলফিন, অসংখ্য পাখি, কুমির কিংবা হরিণ, সব মিলিয়ে এ বন যেন এক জীবন্ত মহাকাব্য। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে এখানে আছে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাখি।
শহরের কোলাহল থেকে মুক্ত হয়ে যখন দাঁড়িয়ে থাকবেন সুন্দরবনের গহিনে, তখন বুঝবেন প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার অনুভূতি কাকে বলে। শুধু চোখে নয়, মনে রয়ে যাবে আজীবন।
[308]
[235]
[82]

আপনার মতামত লিখুন