বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন আবারও এক অনিশ্চিত পর্যটন মৌসুমের মুখে।
নভেম্বর মাসে পর্যটকরা কেবল দিনের বেলায় ঘুরতে পারবেন, রাত্রিযাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সীমিতভাবে থাকা যাবে, আর ফেব্রুয়ারিতে পুরোপুরি বন্ধ থাকবে পর্যটক যাতায়াত।
দুই বছর আগেও টেকনাফ থেকে নিয়মিত জাহাজে পর্যটকরা যেতেন সেন্ট মার্টিনে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র তৎপরতার কারণে ওই নৌপথ এখন বন্ধ। ফলে জাহাজগুলো চলছে কক্সবাজার থেকে, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়সাধ্য।
সকাল ৯টায় যাত্রা শুরু করা জাহাজগুলো সেন্ট মার্টিন পৌঁছায় প্রায় সন্ধ্যায়। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৫টার মধ্যেই ফিরে আসতে হবে।
অর্থাৎ, একজন পর্যটকের হাতে ঘোরার সময় মাত্র দুই ঘণ্টা!
সেন্ট মার্টিন হোসাইন জুহুরা ফাউন্ডেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম জিহাদী বলেন,
“১৪-১৫ ঘণ্টা সমুদ্রে জার্নি করে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য কেউ আসবে কেন? নভেম্বর-ডিসেম্বরে যখন মানুষ ঘুরতে চায়, তখনই রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ।”
তার প্রশ্ন, “এই এক মাসের আয়ে দ্বীপের মানুষ ১১ মাস চলবে কীভাবে?”
পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ১২ দফা নির্দেশনা জারি করেছে ‘পরিবেশবান্ধব পর্যটন নির্দেশিকা ২০২৩’-এর আওতায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
অন্তর্বর্তী সরকারের পর থেকে পর্যটন নীতিতে কঠোরতা আনার ফলে দ্বীপের প্রায় ২০০ পরিবার দ্বীপ ছেড়ে গেছে।
অনেকে এখন টেকনাফ বা কক্সবাজারে ইজিবাইক, ভ্যান বা দিনমজুরির কাজ করছেন।
দ্বীপের বাসিন্দা হামিদ হোসেন বলেন,
“সেন্ট মার্টিনে আয় না থাকায় টেকনাফে অটোরিকশা চালাচ্ছি। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।”
গত মৌসুমে পর্যটক সীমিত হওয়ায় হোটেল-রিসোর্ট মালিকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন।
অনেকে বিনিয়োগের টাকা তুলতে পারেননি, এবার অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা করছেন সবাই।
সেন্ট মার্টিন রিসোর্ট মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুর রহমান বলেন,
“নভেম্বরে রাত্রিযাপন বন্ধ থাকলে দ্বীপে দুর্ভিক্ষ শুরু হবে। আমরা চাই অন্তত প্রথম তিন মাস পর্যটকদের থাকা অনুমতি দেওয়া হোক।”
দ্বীপে পর্যটকদের ওঠানামার একমাত্র জেটির সংস্কার কাজ এখনো শেষ হয়নি।
এতে জাহাজ ভেড়ার সমস্যায় পুরো মৌসুমে পর্যটক পরিবহন ঝুঁকিতে পড়বে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কাজ বিলম্বিত হলেও মৌসুমের আগেই শেষ করার চেষ্টা চলছে।
রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা ও আরাকান আর্মির ভয় জেলেদের সাগরে নামা বন্ধ করে দিয়েছে।
একদিকে মাছ ধরা বন্ধ, অন্যদিকে পর্যটনও বন্ধ—দ্বীপজীবন এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে।
সেন্ট মার্টিন ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি বলেন,
“আমাদের ৯৫ ভাগ মানুষ পর্যটন ও মাছ শিকার নির্ভর। এখন দুই পথই বন্ধ।”
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘূর্ণিঝড় ও জোয়ারে দ্বীপে এখন নিয়মিত পানি ঢোকে।
স্থানীয়রা সরকারের কাছে চারপাশে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আপাতত বেড়িবাঁধ নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা নেই।
সেন্ট মার্টিনের সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন আজ কঠিন বাস্তবতার মুখে।
পর্যটন বন্ধে পরিবেশ হয়তো টিকবে, কিন্তু জীবিকা হারাবে হাজারো পরিবার।
দ্বীপবাসীর প্রত্যাশা—সরকার পরিবেশের ভারসাম্য রেখে মানুষের জীবিকা রক্ষার পথও খুঁজবে।

মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন আবারও এক অনিশ্চিত পর্যটন মৌসুমের মুখে।
নভেম্বর মাসে পর্যটকরা কেবল দিনের বেলায় ঘুরতে পারবেন, রাত্রিযাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সীমিতভাবে থাকা যাবে, আর ফেব্রুয়ারিতে পুরোপুরি বন্ধ থাকবে পর্যটক যাতায়াত।
দুই বছর আগেও টেকনাফ থেকে নিয়মিত জাহাজে পর্যটকরা যেতেন সেন্ট মার্টিনে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যে সশস্ত্র তৎপরতার কারণে ওই নৌপথ এখন বন্ধ। ফলে জাহাজগুলো চলছে কক্সবাজার থেকে, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়সাধ্য।
সকাল ৯টায় যাত্রা শুরু করা জাহাজগুলো সেন্ট মার্টিন পৌঁছায় প্রায় সন্ধ্যায়। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৫টার মধ্যেই ফিরে আসতে হবে।
অর্থাৎ, একজন পর্যটকের হাতে ঘোরার সময় মাত্র দুই ঘণ্টা!
সেন্ট মার্টিন হোসাইন জুহুরা ফাউন্ডেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম জিহাদী বলেন,
“১৪-১৫ ঘণ্টা সমুদ্রে জার্নি করে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য কেউ আসবে কেন? নভেম্বর-ডিসেম্বরে যখন মানুষ ঘুরতে চায়, তখনই রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ।”
তার প্রশ্ন, “এই এক মাসের আয়ে দ্বীপের মানুষ ১১ মাস চলবে কীভাবে?”
পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ১২ দফা নির্দেশনা জারি করেছে ‘পরিবেশবান্ধব পর্যটন নির্দেশিকা ২০২৩’-এর আওতায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
অন্তর্বর্তী সরকারের পর থেকে পর্যটন নীতিতে কঠোরতা আনার ফলে দ্বীপের প্রায় ২০০ পরিবার দ্বীপ ছেড়ে গেছে।
অনেকে এখন টেকনাফ বা কক্সবাজারে ইজিবাইক, ভ্যান বা দিনমজুরির কাজ করছেন।
দ্বীপের বাসিন্দা হামিদ হোসেন বলেন,
“সেন্ট মার্টিনে আয় না থাকায় টেকনাফে অটোরিকশা চালাচ্ছি। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।”
গত মৌসুমে পর্যটক সীমিত হওয়ায় হোটেল-রিসোর্ট মালিকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন।
অনেকে বিনিয়োগের টাকা তুলতে পারেননি, এবার অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা করছেন সবাই।
সেন্ট মার্টিন রিসোর্ট মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুর রহমান বলেন,
“নভেম্বরে রাত্রিযাপন বন্ধ থাকলে দ্বীপে দুর্ভিক্ষ শুরু হবে। আমরা চাই অন্তত প্রথম তিন মাস পর্যটকদের থাকা অনুমতি দেওয়া হোক।”
দ্বীপে পর্যটকদের ওঠানামার একমাত্র জেটির সংস্কার কাজ এখনো শেষ হয়নি।
এতে জাহাজ ভেড়ার সমস্যায় পুরো মৌসুমে পর্যটক পরিবহন ঝুঁকিতে পড়বে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কাজ বিলম্বিত হলেও মৌসুমের আগেই শেষ করার চেষ্টা চলছে।
রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা ও আরাকান আর্মির ভয় জেলেদের সাগরে নামা বন্ধ করে দিয়েছে।
একদিকে মাছ ধরা বন্ধ, অন্যদিকে পর্যটনও বন্ধ—দ্বীপজীবন এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে।
সেন্ট মার্টিন ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি বলেন,
“আমাদের ৯৫ ভাগ মানুষ পর্যটন ও মাছ শিকার নির্ভর। এখন দুই পথই বন্ধ।”
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘূর্ণিঝড় ও জোয়ারে দ্বীপে এখন নিয়মিত পানি ঢোকে।
স্থানীয়রা সরকারের কাছে চারপাশে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আপাতত বেড়িবাঁধ নির্মাণের কোনো পরিকল্পনা নেই।
[573]
সেন্ট মার্টিনের সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন আজ কঠিন বাস্তবতার মুখে।
পর্যটন বন্ধে পরিবেশ হয়তো টিকবে, কিন্তু জীবিকা হারাবে হাজারো পরিবার।
দ্বীপবাসীর প্রত্যাশা—সরকার পরিবেশের ভারসাম্য রেখে মানুষের জীবিকা রক্ষার পথও খুঁজবে।

আপনার মতামত লিখুন