দৈনিক প্রথম সংবাদ

চিনি খেলে কি বাচ্চারা হাইপারঅ্যাকটিভ হয়? জানুন সত্য

চিনি খেলে কি বাচ্চারা হাইপারঅ্যাকটিভ হয়? জানুন সত্য
ছবি; সংগ্রহিত

চিনি খেলে কি বাচ্চারা হাইপারঅ্যাকটিভ হয়ে যায়?

আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে, চিনি খেলে বাচ্চারা নাকি “হাইপার” হয়ে যায়। জন্মদিনে কেক বা মিষ্টি খেলেই অনেক সময় অভিভাবকরা বলেন, “দেখো, এখন ওর শক্তি বেড়ে গেছে!” কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যি নাকি কেবলই ধারণা?
বৈজ্ঞানিকভাবে এখন পর্যন্ত কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে চিনি খেলে শিশুরা সত্যিই হাইপারঅ্যাকটিভ হয়ে যায়। তবে চিনি শরীরে কিছু মানসিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা কখনো কখনো ভুলভাবে “হাইপারঅ্যাকটিভিটি” বলে মনে হয়।

চিনি ও হাইপারঅ্যাকটিভিটির সম্পর্ক: প্রচলিত ধারণা বনাম বাস্তবতা

অনেকেই মনে করেন, চিনি মস্তিষ্কে “ডোপামিন” নামক একটি রাসায়নিক হরমোনের মাত্রা বাড়ায়, যা আনন্দের অনুভূতি দেয় এবং আচরণে উত্তেজনা আনতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অল্প সময়ের জন্য শরীরে শক্তির বৃদ্ধি ঘটায়, কিন্তু সেটা হাইপারঅ্যাকটিভ আচরণ নয়। অ্যামান্ডা অ্যাভেরি, ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামের পুষ্টিবিদ, বলেন -
“চিনি রিওয়ার্ড সিস্টেম সক্রিয় করলেও, এটিকে হাইপারঅ্যাকটিভিটির কারণ হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা যায়নি।”

বিজ্ঞান কী বলে: গবেষণার ফলাফল

১৯৯০-এর দশকে প্রকাশিত JAMA জার্নালের এক মেটা-বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চিনি শিশুদের আচরণ বা জ্ঞানীয় দক্ষতার ওপর সরাসরি কোনও প্রভাব ফেলে না। তবে কিছু শিশু, বিশেষ করে যারা ADHD (Attention Deficit Hyperactivity Disorder)-এ আক্রান্ত, তারা অতিরিক্ত চিনি খেলে আচরণে পরিবর্তন দেখাতে পারে। এছাড়া কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে, চিনি গ্রহণের পর রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বেড়ে আবার কমে গেলে (Reactive Hypoglycemia) সাময়িকভাবে আচরণে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে - কিন্তু সেটি স্থায়ী বা ক্লিনিক্যাল হাইপারঅ্যাকটিভিটি নয়।

অভিভাবকদের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মায়েদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করতেন যে তাদের সন্তান চিনি খেয়েছে, তারা শিশুদের আচরণকে “বেশি হাইপারঅ্যাকটিভ” হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন -
যদিও বাচ্চারা আসলে চিনি নয়, চিনির বিকল্প (প্লাসেবো) খেয়েছিল। অর্থাৎ, অনেক সময় চিনির প্রভাব নয়, বরং আমাদের ধারণাই শিশুর আচরণ নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা তৈরি করে।

অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার স্বাস্থ্যঝুঁকি

যদিও চিনি সরাসরি হাইপারঅ্যাকটিভিটির কারণ নয়, তবুও এর অতিরিক্ত গ্রহণ নানা স্বাস্থ্য সমস্যার জন্ম দেয়।

স্থূলতা ও ডায়াবেটিস

অতিরিক্ত চিনি শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি সরবরাহ করে, যা সময়ের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

হৃদরোগ

বেশি চিনি খেলে ট্রাইগ্লিসারাইড ও এলডিএল কোলেস্টেরল বেড়ে যায়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

 দাঁতের ক্ষয়

চিনি দাঁতের এনামেল নষ্ট করে ক্যাভিটি বা দাঁতের ক্ষয় ঘটায়।

শিশুর জন্য নিরাপদ চিনি গ্রহণের পরিমাণ

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে -
২ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৬ চা-চামচ বা ২৪ গ্রাম “অ্যাডেড সুগার” গ্রহণ করা উচিত নয়। একটি ১২ আউন্স ক্যান কোকাকোলায় প্রায় ৪০ গ্রাম চিনি থাকে, অর্থাৎ একদিনের সীমার অনেক বেশি!

বাচ্চার খাদ্যাভ্যাসে চিনি নিয়ন্ত্রণের উপায়

  • ধীরে ধীরে মিষ্টি খাবার কমিয়ে আনুন
  • নিয়মিত খাবারের রুটিন তৈরি করুন (প্রতি ৩-৪ ঘণ্টায় হালকা খাবার)
  • মিষ্টির সঙ্গে প্রোটিন, ফাইবার বা ফ্যাট যুক্ত করুন - যেমন:
  • কুকি + দুধ
  • ক্যান্ডি + পিনাট বাটার ক্র্যাকার
  • আইসক্রিম + বাদাম বা ওট টপিং
  • বেশি পানি পান করতে উৎসাহ দিন
  • বিশেষ দিনে মিষ্টিকে “পুরস্কার” নয়, খাবারের অংশ করুন

চিনি নয়, মূল সমস্যা অতিরিক্ততা

চিনি খেলে বাচ্চারা হাইপারঅ্যাকটিভ হয়, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। তবে চিনি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, যদি তা সীমার বাইরে খাওয়া হয়।

তাই শিশুর খাদ্যতালিকায় পরিমিত চিনি রাখুন, কিন্তু ভয় পাবেন না, চিনি খেলে সে “হাইপার” হয়ে যাবে, এমন প্রমাণ এখনো নেই।

বিষয় : হাইপারঅ্যাকটিভিটি চিনি নিয়ন্ত্রণ শিশুদের খাদ্যাভ্যাস sugar hyperactivity myth অতিরিক্ত চিনি

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক প্রথম সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬


চিনি খেলে কি বাচ্চারা হাইপারঅ্যাকটিভ হয়? জানুন সত্য

প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৫

featured Image

চিনি খেলে কি বাচ্চারা হাইপারঅ্যাকটিভ হয়ে যায়?

আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে, চিনি খেলে বাচ্চারা নাকি “হাইপার” হয়ে যায়। জন্মদিনে কেক বা মিষ্টি খেলেই অনেক সময় অভিভাবকরা বলেন, “দেখো, এখন ওর শক্তি বেড়ে গেছে!” কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যি নাকি কেবলই ধারণা?
বৈজ্ঞানিকভাবে এখন পর্যন্ত কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে চিনি খেলে শিশুরা সত্যিই হাইপারঅ্যাকটিভ হয়ে যায়। তবে চিনি শরীরে কিছু মানসিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা কখনো কখনো ভুলভাবে “হাইপারঅ্যাকটিভিটি” বলে মনে হয়।

চিনি ও হাইপারঅ্যাকটিভিটির সম্পর্ক: প্রচলিত ধারণা বনাম বাস্তবতা

অনেকেই মনে করেন, চিনি মস্তিষ্কে “ডোপামিন” নামক একটি রাসায়নিক হরমোনের মাত্রা বাড়ায়, যা আনন্দের অনুভূতি দেয় এবং আচরণে উত্তেজনা আনতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অল্প সময়ের জন্য শরীরে শক্তির বৃদ্ধি ঘটায়, কিন্তু সেটা হাইপারঅ্যাকটিভ আচরণ নয়। অ্যামান্ডা অ্যাভেরি, ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামের পুষ্টিবিদ, বলেন -
“চিনি রিওয়ার্ড সিস্টেম সক্রিয় করলেও, এটিকে হাইপারঅ্যাকটিভিটির কারণ হিসেবে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করা যায়নি।”

বিজ্ঞান কী বলে: গবেষণার ফলাফল

১৯৯০-এর দশকে প্রকাশিত JAMA জার্নালের এক মেটা-বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চিনি শিশুদের আচরণ বা জ্ঞানীয় দক্ষতার ওপর সরাসরি কোনও প্রভাব ফেলে না। তবে কিছু শিশু, বিশেষ করে যারা ADHD (Attention Deficit Hyperactivity Disorder)-এ আক্রান্ত, তারা অতিরিক্ত চিনি খেলে আচরণে পরিবর্তন দেখাতে পারে। এছাড়া কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে, চিনি গ্রহণের পর রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বেড়ে আবার কমে গেলে (Reactive Hypoglycemia) সাময়িকভাবে আচরণে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে - কিন্তু সেটি স্থায়ী বা ক্লিনিক্যাল হাইপারঅ্যাকটিভিটি নয়।

অভিভাবকদের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মায়েদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করতেন যে তাদের সন্তান চিনি খেয়েছে, তারা শিশুদের আচরণকে “বেশি হাইপারঅ্যাকটিভ” হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন -
যদিও বাচ্চারা আসলে চিনি নয়, চিনির বিকল্প (প্লাসেবো) খেয়েছিল। অর্থাৎ, অনেক সময় চিনির প্রভাব নয়, বরং আমাদের ধারণাই শিশুর আচরণ নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা তৈরি করে।

অতিরিক্ত চিনি খাওয়ার স্বাস্থ্যঝুঁকি

যদিও চিনি সরাসরি হাইপারঅ্যাকটিভিটির কারণ নয়, তবুও এর অতিরিক্ত গ্রহণ নানা স্বাস্থ্য সমস্যার জন্ম দেয়।

স্থূলতা ও ডায়াবেটিস

অতিরিক্ত চিনি শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি সরবরাহ করে, যা সময়ের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।

হৃদরোগ

বেশি চিনি খেলে ট্রাইগ্লিসারাইড ও এলডিএল কোলেস্টেরল বেড়ে যায়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

 দাঁতের ক্ষয়

চিনি দাঁতের এনামেল নষ্ট করে ক্যাভিটি বা দাঁতের ক্ষয় ঘটায়।

শিশুর জন্য নিরাপদ চিনি গ্রহণের পরিমাণ

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে -
২ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৬ চা-চামচ বা ২৪ গ্রাম “অ্যাডেড সুগার” গ্রহণ করা উচিত নয়। একটি ১২ আউন্স ক্যান কোকাকোলায় প্রায় ৪০ গ্রাম চিনি থাকে, অর্থাৎ একদিনের সীমার অনেক বেশি!

বাচ্চার খাদ্যাভ্যাসে চিনি নিয়ন্ত্রণের উপায়

  • ধীরে ধীরে মিষ্টি খাবার কমিয়ে আনুন
  • নিয়মিত খাবারের রুটিন তৈরি করুন (প্রতি ৩-৪ ঘণ্টায় হালকা খাবার)
  • মিষ্টির সঙ্গে প্রোটিন, ফাইবার বা ফ্যাট যুক্ত করুন - যেমন:
  • কুকি + দুধ
  • ক্যান্ডি + পিনাট বাটার ক্র্যাকার
  • আইসক্রিম + বাদাম বা ওট টপিং
  • বেশি পানি পান করতে উৎসাহ দিন
  • বিশেষ দিনে মিষ্টিকে “পুরস্কার” নয়, খাবারের অংশ করুন

চিনি নয়, মূল সমস্যা অতিরিক্ততা

চিনি খেলে বাচ্চারা হাইপারঅ্যাকটিভ হয়, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। তবে চিনি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, যদি তা সীমার বাইরে খাওয়া হয়।
[857]
তাই শিশুর খাদ্যতালিকায় পরিমিত চিনি রাখুন, কিন্তু ভয় পাবেন না, চিনি খেলে সে “হাইপার” হয়ে যাবে, এমন প্রমাণ এখনো নেই।


দৈনিক প্রথম সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক ঃ নাঈম মাহমুদ
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক প্রথম সংবাদ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

শিরোনাম

দৈনিক প্রথম সংবাদ স্বাধীনবাংলা সাহিত্য পরিষদের বরিশাল বিভাগীয় কমিটি ২০২৬ গঠিত দৈনিক প্রথম সংবাদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ইউনিট ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ দৈনিক প্রথম সংবাদ স্বপ্নের স্কলারশিপে অস্ট্রেলিয়া, সব খরচ দেবে মোনাশ দৈনিক প্রথম সংবাদ বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ২০২৬ Bangladesh Bank Job Circular 2026 দৈনিক প্রথম সংবাদ রাণীশংকৈলে ষড়জ শিল্পী গোষ্ঠীর উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ দৈনিক প্রথম সংবাদ গাইবান্ধায় পাঁচটি সংসদীয় আসনে ১৬ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল দৈনিক প্রথম সংবাদ নীলফামারী সিভিল সার্জনের কার্যালয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ২০২৬ CS Nilphamari Job Circular 2026 দৈনিক প্রথম সংবাদ নতুন বছর ২০২৬: সুখী ও সুস্থ থাকতে ৮টি কার্যকর জীবনশৈলী পরিবর্তন দৈনিক প্রথম সংবাদ ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ২০২৬ FRC Job Circular 2026 দৈনিক প্রথম সংবাদ ভারতে চীনা সন্দেহে ছাত্র হত্যা: উত্তরাখণ্ডে তীব্র ক্ষোভ