ডা. ধনদেব বর্মন: স্বাস্থ্যের ডিজির সঙ্গে বাগবিতণ্ডা
ডা. ধনদেব বর্মনকে বহিষ্কার নির্দেশ: স্বাস্থ্যের ডিজির সঙ্গে বাগবিতণ্ডা, ভিডিও ভাইরাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তীব্র প্রতিক্রিয়াময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে
আলোচিত ঘটনার জন্ম দিয়েছেন ডা. ধনদেব বর্মন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের
মহাপরিচালক বা স্বাস্থ্যের ডিজি অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর-এর সঙ্গে
প্রকাশ্য বাগবিতণ্ডা, তার জেরে বহিষ্কারের নির্দেশ এবং ঘটনার ভিডিও
ভাইরাল হওয়া-সব মিলিয়ে গোটা দেশের স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে আলোচনার ঝড়
উঠেছে। এই ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়, বরং সরকারি হাসপাতালগুলোর স্বাস্থ্য
ব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট ও প্রশাসনিক আচরণ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে
দিয়েছে।শনিবার সকালে শিশুদের মূত্রাশয় ও প্রজননতন্ত্রের রোগ সংক্রান্ত
চিকিৎসা অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আয়োজিত একটি সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে ময়মনসিংহ
মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন স্বাস্থ্যের ডিজি। সেমিনারে অংশ নেওয়ার আগে তিনি
হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ, বিশেষ করে জরুরি বিভাগ বা ক্যাজুয়ালটি
পরিদর্শনে যান। এ সময় সেবার মান, রোগী ব্যবস্থাপনা, স্টাফ উপস্থিতি এবং প্রশাসনিক
শৃঙ্খলা নিয়ে তিনি একাধিক প্রশ্ন তোলেন।পরিদর্শনকালে ক্যাজুয়ালটি বিভাগের ইনচার্জ ডা. ধনদেব বর্মন তার
বিভাগের বাস্তব অবস্থা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের তীব্র জনবল সংকট,
বিপুল সংখ্যক রোগী এবং সীমিত অবকাঠামোর মধ্যেই চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করছেন। এসব
সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই
বক্তব্যের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দু’পক্ষের মধ্যে শুরু হয় উত্তপ্ত
বাক্যবিনিময়।প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে স্বাস্থ্যের ডিজি
অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ঘটনাস্থলেই ডা. ধনদেব বর্মনকে বহিষ্কারের নির্দেশ
দেন। মুহূর্তের মধ্যেই বিষয়টি হাসপাতালজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পরে ঘটনার ভিডিও
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এবং সাধারণ
মানুষ থেকে শুরু করে চিকিৎসক সমাজ-সব মহলেই শুরু হয় তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা।এই ঘটনার পর চিকিৎসক মহল দুই ভাগে বিভক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।
এক পক্ষ মনে করছেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে প্রকাশ্যে এ ধরনের আচরণ প্রশাসনিক
শৃঙ্খলার পরিপন্থী এবং তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে আরেক পক্ষের মত,
একজন চিকিৎসক যদি তার বিভাগের বাস্তব সংকট ও কাজের চাপ তুলে ধরেন, সেটিকে
ঔদ্ধত্য হিসেবে দেখা না গিয়ে সমস্যার সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। তাদের
মতে, দ্রুত বহিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা.
মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পরিদর্শনের সময়
সেবার মান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা মোটেও
কাম্য নয়। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার বক্তব্যে স্পষ্ট, ঘটনাটি এখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পর্যায়ে রয়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, ডা. ধনদেব বর্মন-কে ঘিরে এই ঘটনা দেশের সরকারি
হাসপাতালগুলোর বাস্তব চিত্র সামনে এনে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যখাতে যে জনবল
ঘাটতি, অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা রয়েছে,
তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মাঠপর্যায়ে কর্মরত চিকিৎসকরা প্রতিদিন এসব চ্যালেঞ্জ
মোকাবিলা করেই রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সেই বাস্তবতা অনুধাবন না করেই যদি
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও
মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, একজন চিকিৎসকের প্রকাশ্য তর্ক
শোভন নয়। আবার অনেকেই বলছেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভেতরের সংকট সামনে না
এলে সমাধানের পথও খোলা যায় না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটিকে স্বাস্থ্যখাতে
দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।সব মিলিয়ে ডা. ধনদেব বর্মন ও স্বাস্থ্যের ডিজির মধ্যে হওয়া এই বাগবিতণ্ডা
দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক আচরণ এবং চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে
নতুন করে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনাকে যদি কেবল শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তে
সীমাবদ্ধ না রেখে কাঠামোগত সংস্কারের পদক্ষেপে রূপ দেওয়া যায়, তবেই এই বিতর্ক
থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব হবে। —দৈনিক প্রথম সংবাদ