বাংলাদেশ সরকার ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর তাকে দেশে ফেরাতে আনুষ্ঠানিক আইনি উদ্যোগ দ্রুততর করেছে। জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর এ বিষয়ে নতুন করে কূটনৈতিক নড়াচড়া শুরু হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারতকে নোট ভারবালের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
ভারতকে নোট ভারবাল পাঠানোর প্রস্তুতি
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে ফেরত চেয়ে ভারতকে চিঠি এখনো পাঠানো হয়নি, তবে প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, “চিঠি প্রস্তুত হচ্ছে। আজই পাঠানো হতে পারে। নোট ভারবালের মাধ্যমেই পাঠানো হবে।”
- চিঠির সঙ্গে রায়ের কপি পাঠানো হবে না।
- নোট ভারবালে শুধু রায়ের বিষয়টি জানিয়ে হস্তান্তরের অনুরোধ করা হবে।
- বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত সোমবার রায়ে উল্লেখ করে যে, জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনে শেখ হাসিনার ভূমিকা ছিল “পর্যাপ্তভাবে প্রমাণিত”।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়;
- শেখ হাসিনা অনুশোচনা প্রকাশ করেননি।
- উসকানিমূলক ও ঘৃণাসূচক বক্তব্য দিতে থাকেন।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ছড়িয়েছেন।
- নিজের বিরুদ্ধে ২২৬টি মামলা থাকার কথা উল্লেখ করে ২২৬ জনকে হত্যার “লাইসেন্স আছে” এমন মন্তব্যকেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি এখনো প্রকাশিত হয়নি, তবে এসব মৌখিক মন্তব্যই ইতোমধ্যে দেশজুড়ে রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর চিঠি পাঠানো হচ্ছে দ্বিতীয়বার
গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। সে সময় অন্তর্বর্তী সরকার তাকে ফেরত চেয়ে একবার চিঠি পাঠিয়েছিল।
কিন্তু সেই চিঠির কোনো জবাব ভারত দেয়নি।
এবার পরিস্থিতি ভিন্ন, কারণ এবার রয়েছে একটি আনুষ্ঠানিক মৃত্যুদণ্ডের রায়, যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যর্পণ চুক্তি নতুনভাবে সক্রিয় হয়েছে।
বাংলাদেশের ভেতরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে
শেখ হাসিনার রায়কে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের ভেতরে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা রায়ের পর প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে সংকোচ বোধ করছেন।
তৃণমূল থেকে শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত ধস নেমেছে।
লকডাউন, বিক্ষোভ, শাটডাউনের ডাক দিয়েও আওয়ামী লীগ প্রত্যাশিত জনসমর্থন পায়নি।রায়ের পর দলটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলতে শুরু করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “শেখ হাসিনা যেহেতু ভারতে আছেন এবং প্রত্যর্পণের ঝুঁকিতে, তাই দলীয় নেতৃত্বেও অস্থিরতা বাড়বে।”
কূটনৈতিকভাবে অবস্থান জটিল হতে পারে
ভারত–বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে বন্দি বা দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত পাঠানো সম্ভব।
- ভারত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
- নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ সরকার চাইছে বিষয়টি দ্রুত সমাধান হোক।
- ইন্টারপোলেও নোটিশ পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে চাপ বাড়াতে পারে।
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর দেশ–বিদেশে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তাকে ফেরাতে নোট ভারবাল পাঠানোর প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে, এটি চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। বাংলাদেশ–ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন পরীক্ষাও এখন শুরু হলো।
আপনার মতামত লিখুন