ডিসেম্বর মাস মানেই বাঙালি জাতির আবেগ, ইতিহাস, গৌরব আর সংগ্রামের প্রতীক। প্রতি বছর যেমন, এবারও শুরু হলো বিজয়ের মাস। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার স্মৃতি আজও জাতিকে অনুপ্রাণিত করে, স্মরণ করিয়ে দেয় অগণিত শহিদের আত্মত্যাগ, দুঃখ-বেদনা ও বীরত্বের গল্প।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে উদ্ভব ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের যে স্বপ্ন ১৯৫২–এর আন্দোলনে জাগ্রত হয়, তার পরিপূর্ণতা আসে এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে। ডিসেম্বর তাই শুধু উৎসবের মাস নয়; এটি বাঙালির হাজার বছরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আত্মমর্যাদার মুক্তির প্রতীক।
জাতীয় স্মৃতিসৌধে কঠোর নিরাপত্তা
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে,
বিজয় দিবস ২০২৫ উপলক্ষে সাভারের
জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও আশপাশের এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী;
- ১৩ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাভার স্মৃতিসৌধ এলাকায় যান চলাচল সীমিত থাকবে।
- ১৬ ডিসেম্বর রাত ৩টা থেকে সকাল ৮:৩০ পর্যন্ত স্মৃতিসৌধ এলাকায় যানবাহন ও সাধারণ মানুষের প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।
- পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি নির্বিঘ্ন করতে এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রতি বছরের মতো এবারও ভোর থেকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ পরিবারের সদস্য এবং সর্বসাধারণ
স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
ডিসেম্বরের প্রথম ১৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা বিএনপির
বিজয় মাস উপলক্ষে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি মাসব্যাপী কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। শনিবার গুলশানের দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান,
‘‘বিজয়ের মাসে বিজয় মশাল রোড শো’’ শীর্ষক দেশের বিভিন্ন বিভাগে বিশেষ কর্মসূচি পালন করবে দলটি।
তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও গণতান্ত্রিক অধিকারহীনতা কাটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ‘‘ফ্যাসিবাদমুক্ত’’ হয়েছে, এ দাবি তুলে বিএনপি বিজয়ের এ উল্লাসকে জনগণের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায়।
ঐতিহাসিক কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে যাত্রা শুরু
১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে
‘‘বিজয় মশাল রোড শো’’ এর উদ্বোধন হবে। এই স্থানটিই ১৯৭১ সালের মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণার ঐতিহাসিক কেন্দ্র। এরপর কর্মসূচি কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন বিভাগে অনুষ্ঠিত হবে।
প্রতিটি বিভাগে অংশ নেবেন
একজন মুক্তিযোদ্ধা ও একজন ‘‘জুলাইযোদ্ধা’’।রোড শো চলাকালীন থাকবে;
- গান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা
- ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী
- ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন
- দলের রোডম্যাপ ও রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা
১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় এসে এই রোড শো শেষ হবে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে।
বিজয় আনন্দের পাশাপাশি ডিসেম্বর বয়ে আনে বেদনাবিধূর ইতিহাসও। ১৯৭১ সালের শেষ প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাজাকার, আলবদর ও আল-শামসের সহযোগিতায় দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের নির্মমভাবে হত্যা করে। এই বুদ্ধিজীবী নিধন মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক ভয়াবহ, অমানবিক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
ডিসেম্বরের প্রথম দিনগুলো থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণে হানাদার বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। অবশেষে
১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে তাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।
বাঙালি জাতির গৌরবময় ইতিহাসে ডিসেম্বর তাই শুধু ক্যালেন্ডারের মাস নয়,এটি স্বাধীনতার প্রতীক, আত্মমর্যাদার প্রতিশ্রুতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শেখার অনন্য পাঠ।
বিজয়ের মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, এই দেশ অর্জিত হয়েছে অগণিত আত্মত্যাগের বিনিময়ে। সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষাই এখন জাতির প্রধান প্রতিশ্রুতি।
আপনার মতামত লিখুন