ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেও এক ভিন্ন ও মানবিক দৃশ্য দেখা যাচ্ছে ঢাকা–১৪ আসনে। বহুদিনের রাজনৈতিক হানাহানি, বিভাজন ও উত্তেজনার পরিবর্তে এখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে দুই তরুণ প্রার্থী, বিএনপির সানজিদা ইসলাম তুলি এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান।
দুজনই গুমের শিকার পরিবার থেকে উঠে আসা; তুলি তার হারিয়ে যাওয়া ভাই সুমনের জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছেন, আর আরমান নিজে ছিলেন গুমের শিকার। তবু তারা প্রতিপক্ষকে সম্বোধন করছেন ‘ভাই’ ও ‘বোন’ হিসেবে, যা স্থানীয় রাজনীতিতে তৈরি করেছে এক অন্যরকম ইতিবাচক পরিবেশ।
তুলির আবেগঘন বক্তব্যে আলোড়ন
নারী নেতৃত্বের নতুন মুখ তুলি প্রথমবার অংশ নিচ্ছেন নির্বাচনে। গুম হওয়া ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমনের স্মৃতি তাকে প্রতিদিনই আন্দোলনে ও মানবাধিকার সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করেছে।
প্রচারণার মিছিলে ও পথসভায় তিনি বলেন-
“ব্যারিস্টার আরমানের শরীরে আমি আমার হারিয়ে যাওয়া ভাই সুমনের সুঘ্রাণ পাই।”এই আবেগঘন বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তুলির প্রচারণায় আক্রমণ নেই, উত্তেজনা নেই, বরং মানবিক, শান্ত, যুক্তিনির্ভর কথা। তিনি বলেছেন,
“অপরাজনীতি নয়, এবার সময় মানবিক রাজনীতির।”তুলির সঙ্গে মাঠে সক্রিয় আছেন বিএনপি নেতা মাহদি আমিন। নারীদের ছোট ছোট বৈঠক, গণসংযোগ, লিফলেট বিতরণ, সব মিলিয়ে তুলির ক্যাম্পেইনে নতুন প্রাণ এসেছে।
নিজেও গুমের শিকার ছিলেন ব্যারিস্টার আরমান
অন্যদিকে
ব্যারিস্টার আরমান, যিনি বাবার মামলায় লড়তে দেশে এসে আট দীর্ঘ বছর অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি ছিলেন। মুক্তি পেয়ে তিনি যে শান্ত ও দায়িত্বশীল সুরে মানুষের কাছে ফিরে এসেছেন, তা এলাকাবাসীর নজর কেড়েছে।
আরমান বলেন-
“প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা হবে মানুষের কল্যাণে; শত্রুতায় নয়।”তিনি তুলিকে “বোন” বলে সম্বোধন করে বলেছেন-
“ঢাকা–১৪–এ আমরা মানবিক রাজনীতির উদাহরণ তৈরি করব।”হুড খোলা গাড়িতে করে বাজার–মসজিদ–অলিগলি ঘুরে তিনি মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্যতা ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
ভোটাররা চাইছেন উন্নয়ন ও নিরাপত্তা
মিরপুর, গাবতলী, দারুস সালাম, শাহ আলী থানা এবং সাভারের কাউন্দিয়া–বনগাঁও নিয়ে বিস্তৃত ঢাকা–১৪ আসনে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখের বেশি। এলাকার প্রধান সমস্যা, কাউন্দিয়া ও বনগাঁওয়ের মধ্যে ব্রিজ না থাকায় হাজারো মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ। নৌকাই তাদের ভরসা।
ভোটারদের দাবি- প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, দৃশ্যমান উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং কাজের রাজনীতি, আরমান–তুলি দুজনেই ব্রিজ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এতে ভোটারদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে।
দলগুলোর ভিন্ন ভাবনা ও রাজনৈতিক বার্তা
বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, এই নির্বাচনে দল ত্যাগ, সংগ্রাম, মানবাধিকার আন্দোলন ও জনসম্পৃক্ততা দেখে তুলিকে মনোনয়ন দিয়েছে। তাদের দাবি-অর্থ নয়, প্রভাব নয়, অগ্রাধিকার পেয়েছে ত্যাগ ও যোগ্যতা,
জামায়াতে ইসলামীও আরমানকে ঘিরে নতুন আস্থা দেখছে। দীর্ঘ নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, শান্ত স্বভাব, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আইনজ্ঞান তাকে তরুণদের কাছে এক সাহসী নতুন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে।
জামায়াত নেতারা বলছেন-
“আরমান দেখিয়েছেন, রাজনীতি মানে উত্তেজনা নয়—নৈতিকতা, মানবিকতা ও জনগণের সমস্যা সমাধানের আন্তরিক প্রচেষ্টা।”
নির্বাচনী মাঠে নতুন বার্তা: শত্রুতা নয়, শ্রদ্ধা
বহু বছর ধরে রাজনীতির বিভক্তি, উত্তেজনা ও হুমকি–ধামকির যে ছবি দেখা গেছে, এবার
ঢাকা–১৪–এ উল্টো একটি দৃশ্য তৈরি হয়েছে। এলাকার চায়ের দোকান, বাজার ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন
আরমান–তুলির ভাই–বোন সম্পর্ক এবং তাদের সুশীল আচরণ।
স্থানীয়রা বলছেন,
“এমন মানুষই রাজনীতিতে দরকার, যারা শত্রুতা নয়, দায়িত্ব বুঝে মানুষের জন্য কাজ করবে।”
এই নির্বাচনে ঢাকা–১৪ আসন শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয়, এটি মানবিক মূল্যবোধ, শ্রদ্ধা, সৌজন্য ও নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির নতুন এক দৃষ্টান্ত। ব্যারিস্টার আরমান ও তুলি, দুজনই গুম–সংশ্লিষ্ট ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে সামনে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু শত্রুতা নয়; মানুষের কল্যাণ নিয়ে কথা বলছেন।
ভোটের মাঠে শেষ হাসি কে হাসবেন তা সময় বলবে, তবে ভোটারদের চাওয়া,
উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং কাজের রাজনীতি, এবার যেন বাস্তবেই আসে।
আপনার মতামত লিখুন