রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: কিয়েভে সমন্বিত হামলা, আগুন-ধ্বংসে স্তব্ধ রাজধানী
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন করে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শুক্রবার ভোরে রাশিয়া রাজধানী কিয়েভে বৃহৎ আকারের সমন্বিত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালে শহরের প্রায় প্রত্যেক জেলায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানান, হামলায় অন্তত ১১ জন আহত হয়েছে, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর। দমকল ও জরুরি সেবা কর্মীরা শহরের বিভিন্ন এলাকায় একযোগে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।
কিয়েভের প্রায় সব জেলায় আগুন ও ক্ষয়ক্ষতি
কিয়েভ সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর টকাচেঙ্কো জানান-
“রুশ বাহিনী আবাসিক এলাকাগুলো লক্ষ্য করছে। বহু জেলায় বহুতল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- দার্নিতস্কি
- দিনিপ্রোভস্কি
- পডিলস্কি
- সোলোমিয়ানস্কি
- অবোলোনস্কি
কোথায় কী ক্ষতি হয়েছে:
দার্নিতস্কি: আবাসিক ভবনের আঙিনায় বিস্ফোরণের ধ্বংসাবশেষ, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে আগুন, ব্যক্তিগত গাড়ি পুড়ে যায়।
দিনিপ্রোভস্কি: তিনটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ক্ষতিগ্রস্ত, একটি ব্যক্তিগত বাড়ি ও খোলা জায়গায় আগুন।
পডিলস্কি: পাঁচটি আবাসিক ভবন ও একটি নন-রেসিডেনশিয়াল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত।
জরুরি সেবা জানায়, বহু জায়গায় আগুন নেভাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আহত ও উদ্ধার অভিযান
হামলায় পাঁচজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে-
- একজন গুরুতর অবস্থায়
- একজন গর্ভবতী নারী
- আরও কয়েকজন বাসিন্দা
জরুরি সেবা বিভাগ জানায়,
- ২৪ জনের বেশি আহত
- ৪০ জনের বেশি লোককে উচ্চ ভবন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে
বিদ্যুৎ, পানি ও হিটিং সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত
মেয়র ক্লিচকো জানান, শহরের একটি জেলার হিটিং সিস্টেমে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তিনি সতর্ক করেছেন-
বিদ্যুৎ, পানি, গরম করার সেবা, যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কিয়েভের বাইরে: ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা
রাশিয়ার রাতভর হামলায় শুধু কিয়েভ নয়, ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যেসব অঞ্চলে হামলা হয়েছে-
- খেরসন
- জাপোরিঝঝিয়া
- কিরোভোহরাদ
- কিয়েভ উপকণ্ঠ
খেরসনে পরিস্থিতি
খেরসন আঞ্চলিক প্রশাসন প্রধান ওলেক্সান্দর প্রোকুদিন জানান—
- ৩৬টি বসতি এলাকায় গোলাবর্ষণ
- ১ জন নিহত
- ৩ জন আহত
- ১৮টি বাড়ি, দোকান ও পরিবহন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত
জাপোরিঝঝিয়ায় ৭৩১টি হামলা
জাপোরিঝঝিয়ার গভর্নর ইভান ফেদোরভ নিশ্চিত করেছেন—
- ৫টি বিমান হামলা
- ৭টি এমএলআরএস ব্যারেজ
- ৪০০-র বেশি ড্রোন হামলা (FPV)
- মোট ৭৩১টি হামলা, ২০টি বসতি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত
- ৪ জন নিহত
প্রেওব্রাঝেঙ্কায় FPV ড্রোন হামলায় আরও দুইজন নিহত হন, এটি ওই জেলায় একই রাতে দ্বিতীয় প্রাণঘাতী আক্রমণ।
রাশিয়ার দাবি: ২১৬টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে,
- রাতভর ২১৬টি ইউক্রেনীয় ড্রোন আটক
- এর মধ্যে ৬৬টি-ক্রাসনোদর
- ৪৫টি-সারাতোভ
- ১৯টি-ক্রিমিয়া
- বাকি-রোস্তভ, ভলগোগ্রাদ, বেলগোরদ, ব্রিয়ান্সক, ভোরোনেঝসহ বিভিন্ন অঞ্চল
- ৫৯টি ড্রোন-কালো সাগরের আকাশে ধ্বংস
ইউক্রেন এসব দাবি অস্বীকার করেছে।
কিরোভোহরাদে হাজারো মানুষ বিদ্যুৎহীন
কিরোভোহরাদ অঞ্চলের প্রধান আন্দ্রি রাইকোভিচ জানিয়েছেন-
- নোভউক্রাইনকা জেলায় ১৬টি বসতি এলাকায় বিদ্যুৎ নেই
- রাতের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মূল বিদ্যুৎ লাইন নষ্ট
- মেরামতকারী দল কাজ করছে
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সতর্কতা ও প্রতিক্রিয়া
এদিকে ইইউ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন-
- ইউক্রেনকে দুর্নীতি দমনে কঠোর ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে হবে
- সাম্প্রতিক দুর্নীতি কেলেঙ্কারির পর পরমাণু খাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে
- তবে ইউক্রেনের জন্য সহায়তা অব্যাহত থাকবে
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই হামলার মাত্রা ও পরিসর বাড়ছে। কিয়েভের গভীর রাতের এই বড় আক্রমণ আবারও প্রমাণ করল, সংঘাত এখনও নিস্পত্তির কোনো পথে নেই। সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আগুন, ধ্বংসস্তূপ, বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও নিরাপত্তাহীনতায়।
আপনার মতামত লিখুন