নেপালের হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ তুষারধসে সাতজন পর্বতারোহীর মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে পাঁচজন বিদেশি ও দুইজন নেপালি গাইড ছিলেন। ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার সকাল ৯টার দিকে ইয়ালুং রি (Yalung Ri) পাহাড়ের বেস ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায়, যা উত্তর-পূর্ব নেপালের দোলাখা জেলায় অবস্থিত।
তুষারধসের সময় ওই দলে মোট ১৬ জন পর্বতারোহী ছিলেন। উদ্ধার সংস্থা Seven Summit Treks জানায়, এখন পর্যন্ত দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, বাকি পাঁচজন এখনও তুষারের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও উদ্ধার অভিযান
দোলাখা জেলার পুলিশ কর্মকর্তা জ্ঞান কুমার মহাতো জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টার পাঠানো হলেও খারাপ আবহাওয়া ও ঘন তুষারপাতের কারণে হেলিকপ্টার নামতে পারেনি। ফলে উদ্ধারকর্মীরা এখন পদব্রজে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে আটজন আহত পর্বতারোহীকে উদ্ধার করে রাজধানী কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের চিকিৎসা চলছে। উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্বদানকারী মিংমা শেরপা, Seven Summit Treks-এর চেয়ারম্যান বলেন,
“মৃত পর্বতারোহীদের দেহ ১০ থেকে ১৫ ফুট নিচে তুষারের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে। তাদের বের করতে সময় লাগবে।”
নিহত ও নিখোঁজদের পরিচয়
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ীনিহতদের মধ্যে রয়েছেন-
দুইজন ইতালীয়, একজন কানাডীয়, একজন জার্মান, একজন ফরাসি নাগরিক এবং দুইজন নেপালি গাইড। এছাড়া আরও কয়েকজন বিদেশি পর্বতারোহী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ফ্রান্স, কানাডা ও ইতালির নাগরিক থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভিযানের পটভূমি
পর্বতারোহীদের দলটি মূলত ডোলমা খাং (Dolma Khang) নামের ৬,৩৩২ মিটার উচ্চতার একটি শৃঙ্গ আরোহনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। acclimatization বা মানিয়ে নেওয়ার অংশ হিসেবে তারা ৫,৬৩০ মিটার উঁচু ইয়ালুং রি পাহাড়ে উঠছিলেন। এসময় হঠাৎ তুষারধস নেমে আসে এবং বেস ক্যাম্পে থাকা সদস্যরা তাতে চাপা পড়ে যান।
প্রতিকূল আবহাওয়া ও জলবায়ু প্রভাব
গত সপ্তাহে ঘূর্ণিঝড় ‘মোন্থা’র প্রভাবে নেপালে ভারী বৃষ্টি ও তুষারপাত হয়, যার ফলে হিমালয় অঞ্চলে একাধিক জায়গায় তুষারধসের ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের আবহাওয়া ক্রমশ অনির্দেশ্য হয়ে উঠছে, ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
উদ্ধার কার্যক্রমে চ্যালেঞ্জ
পাহাড়ি এলাকা, ঘন তুষারপাত ও অক্সিজেনের অভাবে উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় অভিজ্ঞ শেরপা ও পর্বতগাইডদের সহায়তায় অভিযান চলছে। একজন উদ্ধারপ্রাপ্ত পর্বতারোহী The Kathmandu Post-কে বলেন,
“আমরা বারবার সাহায্যের জন্য ডাকছিলাম, কিন্তু সময়মতো উদ্ধার আসেনি। যদি দ্রুত সাহায্য আসত, হয়তো আরও কয়েকজন বাঁচানো যেত।”
পর্বতারোহণ মৌসুম ও ঝুঁকি
নেপালে শরৎকাল সাধারণত পর্বতারোহণের অন্যতম জনপ্রিয় মৌসুম। কারণ এই সময় আবহাওয়া তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে এবং দৃশ্যমানতাও ভালো হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অকস্মাৎ তুষারপাত ও তীব্র ঠান্ডা হাওয়া অভিযাত্রীদের জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই মাউন্ট এভারেস্টের কাছাকাছি শতাধিক পর্বতারোহী তুষারঝড়ে আটকে পড়েছিলেন, যাদের পরে উদ্ধার করা হয়।
নেপালের ইয়ালুং রি পাহাড়ের এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায়। বৃষ্টি, তুষারঝড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে অভিযাত্রা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
আপনার মতামত লিখুন