বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে দেশের দুই প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ভোট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ডাকসু) এবং **জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু)**র নির্বাচনে তরুণরা যে ফলাফল দিয়েছে, তা দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এক নতুন বার্তা বহন করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের প্রার্থীরা অভাবনীয়ভাবে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছে। ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩টি হলের মধ্যে ভিপি পদে ১০টি ও জিএস পদে ৯টিতে জয়লাভ করেছে শিবির। অন্যদিকে, ছাত্রদল শুধু জগন্নাথ হলে একটি ভিপি পদ অর্জন করতে পেরেছে।
এমন ফলাফল শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা গোষ্ঠীগুলোকেও বিস্মিত করেছে। এক সময় যেসব হলে ধর্মপ্রাণ ছাত্রদের ফজরের নামাজ পড়তে লুকাতে হতো, আজ সেখানে তাদের মুক্তভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ এসেছে।
শুধু ডাকসু নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও তাদের ভোটে নতুন বাস্তবতা প্রতিষ্ঠা করেছে। শিবির এখানে ২০টি পদে জয়লাভ করেছে। জিএসসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে শিবিরের বিজয় দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আলোচনার ঝড় তুলেছে। এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েও ভিপি পদে জয় পেয়েছেন জুলাই বিপ্লবের এক সক্রিয় সমন্বয়ক।
এই ফলাফল শুধু নির্বাচন জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়। এটি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে দেশের তরুণরা ফ্যাসিবাদ, ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও অতি ব্যবহৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বয়ান প্রত্যাখ্যান করছে। তরুণরা নতুন রাজনৈতিক বয়ান খুঁজছে, যেখানে স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও জাতীয়তাবাদই মূল শক্তি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রায় বিএনপির জন্য একটি বিশেষ বার্তা। কারণ, সম্ভাব্য সরকার হিসেবে সামনে আসতে হলে তাদের এখন কার্যকর রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে হবে। গত কয়েক বছরে বিএনপি ইসলামি আদর্শ থেকে কিছুটা সরে গিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদে ঝুঁকেছিল। তবে সেই কৌশল পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। জগন্নাথ হলে ছাত্রদলের জয় তার প্রমাণ। তবে বৃহত্তর সমর্থন অর্জনের জন্য বিএনপিকে নতুনভাবে তাদের কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে শিবির ও ছাত্রদলের সম্পর্ক সবসময়ই জটিল ছিল। ২০১৮ সালের পর থেকে বিএনপি প্রকাশ্যেই জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। অনেক সময় একই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়লেও যৌথ আন্দোলনে তারা এক হতে পারেনি। এর পেছনে মূলত ছাত্রদলের ভেতরের দ্বিধা ও শিবির ফোবিয়া কাজ করেছে।
২০০০-এর দশকে শিবির নিধন অভিযানে রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্যাতিত হওয়ার পর আজকের এই বিজয়কে অনেকে ইতিহাসের অমোঘ বিচার হিসেবে দেখছেন। একসময় যাদের বিরুদ্ধে টর্চার, গ্রেপ্তার, হত্যা চালানো হয়েছিল, সেই শিবিরই আজ বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে একচ্ছত্র বিজয় অর্জন করেছে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আজ একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। তারা আর পুরনো স্লোগান ও ক্লিশে রাজনীতির মধ্যে আটকে থাকতে চায় না। বরং তারা বলছে—
ফ্যাসিবাদকে না
ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান
নতুন জাতীয়তাবাদী বয়ান প্রতিষ্ঠা
স্বচ্ছ ও সাহসী নেতৃত্বের প্রয়োজন
বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা আজ যে বার্তা দিয়েছে, তা শুধু ছাত্ররাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি জাতীয় রাজনীতির জন্যও একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তরুণদের ভাষা ও চাহিদা না বোঝে, তবে তাদের সামনে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে তরুণ প্রজন্মই ভবিষ্যতের কর্ণধার। তাদের ভোট, তাদের আদর্শ এবং তাদের বার্তা জাতীয় রাজনীতিকে নতুন আকার দেবে।

শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে দেশের দুই প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ভোট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ডাকসু) এবং **জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু)**র নির্বাচনে তরুণরা যে ফলাফল দিয়েছে, তা দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এক নতুন বার্তা বহন করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের প্রার্থীরা অভাবনীয়ভাবে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছে। ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে শিবির সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩টি হলের মধ্যে ভিপি পদে ১০টি ও জিএস পদে ৯টিতে জয়লাভ করেছে শিবির। অন্যদিকে, ছাত্রদল শুধু জগন্নাথ হলে একটি ভিপি পদ অর্জন করতে পেরেছে।
এমন ফলাফল শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা গোষ্ঠীগুলোকেও বিস্মিত করেছে। এক সময় যেসব হলে ধর্মপ্রাণ ছাত্রদের ফজরের নামাজ পড়তে লুকাতে হতো, আজ সেখানে তাদের মুক্তভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ এসেছে।
শুধু ডাকসু নয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও তাদের ভোটে নতুন বাস্তবতা প্রতিষ্ঠা করেছে। শিবির এখানে ২০টি পদে জয়লাভ করেছে। জিএসসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে শিবিরের বিজয় দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আলোচনার ঝড় তুলেছে। এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েও ভিপি পদে জয় পেয়েছেন জুলাই বিপ্লবের এক সক্রিয় সমন্বয়ক।
এই ফলাফল শুধু নির্বাচন জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়। এটি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে দেশের তরুণরা ফ্যাসিবাদ, ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও অতি ব্যবহৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বয়ান প্রত্যাখ্যান করছে। তরুণরা নতুন রাজনৈতিক বয়ান খুঁজছে, যেখানে স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও জাতীয়তাবাদই মূল শক্তি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রায় বিএনপির জন্য একটি বিশেষ বার্তা। কারণ, সম্ভাব্য সরকার হিসেবে সামনে আসতে হলে তাদের এখন কার্যকর রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে হবে। গত কয়েক বছরে বিএনপি ইসলামি আদর্শ থেকে কিছুটা সরে গিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদে ঝুঁকেছিল। তবে সেই কৌশল পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। জগন্নাথ হলে ছাত্রদলের জয় তার প্রমাণ। তবে বৃহত্তর সমর্থন অর্জনের জন্য বিএনপিকে নতুনভাবে তাদের কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে শিবির ও ছাত্রদলের সম্পর্ক সবসময়ই জটিল ছিল। ২০১৮ সালের পর থেকে বিএনপি প্রকাশ্যেই জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে। অনেক সময় একই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়লেও যৌথ আন্দোলনে তারা এক হতে পারেনি। এর পেছনে মূলত ছাত্রদলের ভেতরের দ্বিধা ও শিবির ফোবিয়া কাজ করেছে।
২০০০-এর দশকে শিবির নিধন অভিযানে রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্যাতিত হওয়ার পর আজকের এই বিজয়কে অনেকে ইতিহাসের অমোঘ বিচার হিসেবে দেখছেন। একসময় যাদের বিরুদ্ধে টর্চার, গ্রেপ্তার, হত্যা চালানো হয়েছিল, সেই শিবিরই আজ বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনে একচ্ছত্র বিজয় অর্জন করেছে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আজ একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। তারা আর পুরনো স্লোগান ও ক্লিশে রাজনীতির মধ্যে আটকে থাকতে চায় না। বরং তারা বলছে—
ফ্যাসিবাদকে না
ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান
নতুন জাতীয়তাবাদী বয়ান প্রতিষ্ঠা
স্বচ্ছ ও সাহসী নেতৃত্বের প্রয়োজন
বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণরা আজ যে বার্তা দিয়েছে, তা শুধু ছাত্ররাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি জাতীয় রাজনীতির জন্যও একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তরুণদের ভাষা ও চাহিদা না বোঝে, তবে তাদের সামনে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে তরুণ প্রজন্মই ভবিষ্যতের কর্ণধার। তাদের ভোট, তাদের আদর্শ এবং তাদের বার্তা জাতীয় রাজনীতিকে নতুন আকার দেবে।

আপনার মতামত লিখুন