বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে কর্মসংস্থানের চিত্র ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন- এই ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে চাকরি হারিয়েছেন মোট ৯৭৮ জন কর্মী। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। এই সংখ্যা প্রথমে সাধারণ মনে হলেও, খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় নারী কর্মীদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে।
কর্মী সংখ্যা কমেছে প্রায় এক হাজার
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ২৪৫ জন। ছয় মাস পর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুন শেষে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ২ লাখ ১৩ হাজার ২৬৭ জনে। এর মানে, মোট কর্মী কমেছে ৯৭৮ জন।
যেখানে সাধারণভাবে ব্যাংক খাতের কর্মসংস্থানের বাড়ার কথা ছিল, সেখানে উল্টোদিকে এই হ্রাস একটি উদ্বেগজনক বিষয়। বিশেষত ব্যাংক খাত দেশের অন্যতম বড় সাদা-কলার চাকরির ক্ষেত্র হওয়ায় এই পরিবর্তন অনেক পরিবার ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
নারী কর্মীদের অবস্থান সবচেয়ে সংকটাপন্ন
সবচেয়ে বেশি চাকরি হারিয়েছেন নারী কর্মীরা।
অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসে চাকরি হারিয়েছেন ১,৮৬৭ জন নারী। বিপরীতে একই সময়ে পুরুষ কর্মী বেড়েছে ৮৮৯ জন।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে যে কর্মী ছাঁটাই বা চাকরি হারানোর প্রভাব নারীদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি।
বেসরকারি ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব
তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী কর্মী হ্রাসের বড় অংশ ঘটেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে।
অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে চাকরি হারিয়েছেন ২ হাজার ১৪ জন নারী কর্মী।
তবে উল্টোদিকে,
এটি প্রমাণ করে যে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে নারীর কর্মসংস্থান বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
চাকরি হারানোর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনেককে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই সরাসরি চাকরি দেওয়া হয়েছিল। এসব নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল না বলে অভিযোগও রয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই সময়ে নিয়োগ পাওয়া অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী কর্মী। ফলে ব্যাংক খাতে নারীর কর্মসংস্থান হ্রাসের একটি বড় কারণ রাজনৈতিক নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে সেটির সংশোধন প্রক্রিয়া।
উচ্চপর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে
যদিও সামগ্রিকভাবে নারী কর্মী কমেছে, তবে উচ্চপর্যায়ের পদে তাদের উপস্থিতি বেড়েছে।
অন্যদিকে, প্রারম্ভিক পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে।
এ থেকে বোঝা যায়, নারী কর্মীরা ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় উঠে আসছেন, তবে প্রবেশ পর্যায়ে তাদের সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে।
পরিচালনা পর্ষদে নারীর উপস্থিতি হ্রাস
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদেও নারীর উপস্থিতি কমেছে।
এটি ব্যাংকিং খাতে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব হ্রাসের একটি দিক নির্দেশ করছে।
কেন এই পরিবর্তন উদ্বেগজনক
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাতে কর্মী হ্রাস স্বাভাবিক ঘটনা হলেও নারীর কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়া সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভবিষ্যতের জন্য করণীয়
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন- এই ছয় মাসে ব্যাংক খাতে প্রায় এক হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, যার মধ্যে নারী কর্মীদের অবস্থান সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তবে আশার বিষয় হলো, উচ্চপর্যায়ের পদে নারীদের অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে কর্মী হ্রাস দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য একটি সতর্ক সংকেত। বিশেষ করে নারীর কর্মসংস্থান সংকোচন সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়োগ, সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ ও নারী নেতৃত্বের সুযোগ বৃদ্ধি।
যেকোনো সংবাদ সবার আগে পেতে ভিজিট করুন দৈনিক প্রথম সংবাদ এর নিউজ পোর্টালে।
বিষয় : বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকে চাকরি

বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে কর্মসংস্থানের চিত্র ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন- এই ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে চাকরি হারিয়েছেন মোট ৯৭৮ জন কর্মী। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। এই সংখ্যা প্রথমে সাধারণ মনে হলেও, খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় নারী কর্মীদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে।
কর্মী সংখ্যা কমেছে প্রায় এক হাজার
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ২৪৫ জন। ছয় মাস পর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুন শেষে এ সংখ্যা নেমে এসেছে ২ লাখ ১৩ হাজার ২৬৭ জনে। এর মানে, মোট কর্মী কমেছে ৯৭৮ জন।
যেখানে সাধারণভাবে ব্যাংক খাতের কর্মসংস্থানের বাড়ার কথা ছিল, সেখানে উল্টোদিকে এই হ্রাস একটি উদ্বেগজনক বিষয়। বিশেষত ব্যাংক খাত দেশের অন্যতম বড় সাদা-কলার চাকরির ক্ষেত্র হওয়ায় এই পরিবর্তন অনেক পরিবার ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে।
নারী কর্মীদের অবস্থান সবচেয়ে সংকটাপন্ন
সবচেয়ে বেশি চাকরি হারিয়েছেন নারী কর্মীরা।
অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসে চাকরি হারিয়েছেন ১,৮৬৭ জন নারী। বিপরীতে একই সময়ে পুরুষ কর্মী বেড়েছে ৮৮৯ জন।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে যে কর্মী ছাঁটাই বা চাকরি হারানোর প্রভাব নারীদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি।
বেসরকারি ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব
তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী কর্মী হ্রাসের বড় অংশ ঘটেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে।
অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে চাকরি হারিয়েছেন ২ হাজার ১৪ জন নারী কর্মী।
তবে উল্টোদিকে,
এটি প্রমাণ করে যে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে নারীর কর্মসংস্থান বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
চাকরি হারানোর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনেককে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই সরাসরি চাকরি দেওয়া হয়েছিল। এসব নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল না বলে অভিযোগও রয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই সময়ে নিয়োগ পাওয়া অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ নারী কর্মী। ফলে ব্যাংক খাতে নারীর কর্মসংস্থান হ্রাসের একটি বড় কারণ রাজনৈতিক নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে সেটির সংশোধন প্রক্রিয়া।
উচ্চপর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে
যদিও সামগ্রিকভাবে নারী কর্মী কমেছে, তবে উচ্চপর্যায়ের পদে তাদের উপস্থিতি বেড়েছে।
অন্যদিকে, প্রারম্ভিক পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ কমেছে।
এ থেকে বোঝা যায়, নারী কর্মীরা ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় উঠে আসছেন, তবে প্রবেশ পর্যায়ে তাদের সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে।
[160]
পরিচালনা পর্ষদে নারীর উপস্থিতি হ্রাস
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদেও নারীর উপস্থিতি কমেছে।
এটি ব্যাংকিং খাতে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব হ্রাসের একটি দিক নির্দেশ করছে।
কেন এই পরিবর্তন উদ্বেগজনক
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাতে কর্মী হ্রাস স্বাভাবিক ঘটনা হলেও নারীর কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়া সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ভবিষ্যতের জন্য করণীয়
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন- এই ছয় মাসে ব্যাংক খাতে প্রায় এক হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, যার মধ্যে নারী কর্মীদের অবস্থান সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তবে আশার বিষয় হলো, উচ্চপর্যায়ের পদে নারীদের অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে কর্মী হ্রাস দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য একটি সতর্ক সংকেত। বিশেষ করে নারীর কর্মসংস্থান সংকোচন সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়োগ, সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ ও নারী নেতৃত্বের সুযোগ বৃদ্ধি।
যেকোনো সংবাদ সবার আগে পেতে ভিজিট করুন দৈনিক প্রথম সংবাদ এর নিউজ পোর্টালে।

আপনার মতামত লিখুন