চাঁদপুরে সহিংসতা ও দুর্নীতি আওয়ামী লীগের শাসনে লাশের নগরীতে পরিণত জনপদ
বাংলাদেশের অন্যতম শান্তিপ্রিয় জেলা চাঁদপুর, যার পরিচিতি ছিল ইসলামপ্রিয় জনগোষ্ঠী ও সৌহার্দ্যমূলক রাজনীতির জন্য। কিন্তু ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। আওয়ামী লীগের ক্ষমতা দখলের পর শুরু হয় একের পর এক রাজনৈতিক সহিংসতা, খুন-খারাপি, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক দমননীতি। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে এই জনপদ প্রায় ৬ শতাধিক হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হয়, যা অনেকের কাছে চাঁদপুরকে “লাশের নগরী”তে পরিণত করেছে।খুন ও সহিংসতার কালো অধ্যায়জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চাঁদপুরে খুন হয়েছেন ৫৯৮ জন। বিরোধী দলগুলোর দাবি অনুযায়ী, রাজনৈতিক কারণে খুন হয়েছেন অন্তত ৫২ জন। বিশেষ করে ২০১২ ও ২০১৩ সালে বিএনপি ও ছাত্রদল কর্মীদের ওপর হামলা এবং পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয় রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল।অন্যদিকে, ২০২১ সালের হাজীগঞ্জ পূজা মণ্ডপে সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে চারজন নিহতের ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তোলে। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী নেতাদের উসকানিতে এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।গায়েবি মামলা ও দমননীতিএই সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে কোণঠাসা করতে মামলা ব্যবহার করা হয় প্রধান হাতিয়ার হিসেবে। বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের দেয়া তথ্যমতে, ৪১০টি মামলা দায়ের করা হয়, যাতে আসামির সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ জন। এসব মামলার কারণে হাজারো মানুষ হয়রানি, গ্রেপ্তার আতঙ্ক এবং জেল-জুলুমের শিকার হন।দীপু মনি ও বালুখেকো সিন্ডিকেটচাঁদপুরে আওয়ামী রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বালুখেকো সিন্ডিকেটকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া এবং রাজনৈতিকভাবে ত্যাগী নেতাদের দুর্বল করে হাইব্রিড নেতৃত্ব চাপিয়ে দেয়ার।বিশেষ করে তার ভাই ডা. যাওয়াদুর রহিম টিপু এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী সেলিম খানের বিরুদ্ধে অবৈধ বালু উত্তোলন, কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং প্রভাব খাটিয়ে জমি কারসাজির অভিযোগ রয়েছে। দুদকের তথ্যমতে, দীপু মনির বিরুদ্ধে ৮ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলাও চলমান।মায়া, মখা আলমগীর ও শামসুল হক ভূঁইয়ার দাপটচাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আলাদা আলাদা “গডফাদার” হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া: মতলব উত্তর ও দক্ষিণে দীর্ঘ সময় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেছেন।
ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর (মখা আলমগীর): কচুয়ায় গায়েবি মামলা, ব্যাংক লুট এবং প্রতিপক্ষকে দমন করার অভিযোগ রয়েছে। দুদক তার বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির মামলা করেছে।
ড. শামসুল হক ভূঁইয়া: ফরিদগঞ্জ আসনে চারবার নির্বাচিত এই সাবেক এমপির বিরুদ্ধে শত শত একর জমি, চা বাগান এবং ঢাকায় বিপুল সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থান ও পরিবর্তনের ডাক২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় চাঁদপুরেও রক্ত ঝরে। সরকারি হিসেবে এ সময় ৩২ জন নিহত হন। বিরোধী দলগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। এ সময় দীর্ঘদিনের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনতা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।চাঁদপুরের রাজনীতি গত দেড় দশকে সহিংসতা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক দমননীতির কারণে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একসময় সৌহার্দ্যময় জনপদটি পরিণত হয়েছে “লাশের নগরী”-তে। এখন সময় এসেছে সঠিক বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে চাঁদপুরকে সহিংসতা ও দুর্নীতির কালো অধ্যায় থেকে বের করে আনার।