বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দিনে ৩৫ কোটি ডলার লেনদেন
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলেও ডলারের দাম কমে যায়নি। বরং বাংলাদেশ ব্যাংক দাম স্থিতিশীল রাখতে নিয়মিত বাজার থেকে ডলার কিনছে। এর অংশ হিসেবে আজ সোমবার ২৬টি ব্যাংক থেকে ৩৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতি ডলারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা।চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ১৭৪ কোটি ৭৫ লাখ ডলার কিনেছে। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে ডলারের দাম ১২০ টাকার ওপরে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
কেন ডলার কিনছে বাংলাদেশ ব্যাংক?অর্থ পাচার রোধে সরকারের কঠোর অবস্থান, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ও রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির কারণে বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। সাধারণত সরবরাহ বাড়লে দাম কমার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করে দাম স্থিতিশীল রাখছে।প্রতিদিন সকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের রেফারেন্স রেট প্রকাশ করে। বাজারমূল্য এ রেফারেন্সের নিচে নেমে এলে বাংলাদেশ ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ডলার কিনছে। এতে সরবরাহ ও চাহিদা উভয় দিকই নিয়ন্ত্রণে থাকে।
আইএমএফের শর্ত ও বাজারভিত্তিক দামআন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর শর্ত অনুযায়ী ডলারের দাম এখন পুরোপুরি বাজারভিত্তিক। ফলে অতিরিক্ত ডলার থাকা ব্যাংকগুলো নিলামে অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিক্রি করছে। এতে—বাজারে ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকে।বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশের রিজার্ভ আইএমএফের নির্ধারিত মানের চেয়েও বেশি।
অতীত সংকট থেকে শিক্ষা২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে ডলার সংকট দেখা দেয়। তখন প্রতি ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছে যায়। ফলে—মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে,সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে,বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে ২৫ বিলিয়নের বেশি ডলার বিক্রি করতে হয়,যা মূলত জ্বালানি, সার ও খাদ্য আমদানিতে ব্যবহার হয়েছিল।তবে অতিরিক্ত বিক্রির কারণে রিজার্ভ সংকটে পড়ে সরকার। গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ডলার সহায়তা বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তীতে রিজার্ভ বাড়তে শুরু করলে আবার ডলার কেনার পদক্ষেপ নেয়া হয়।
প্রবাসী আয় ও রপ্তানির অবদানদেশের ডলার সংকট কাটাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় এসেছে ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৭% বেশি।চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই (জুলাই-আগস্ট) এসেছে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৮.৪১% বেশি।একই সময়ে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭.৭২%।আমদানি খাতে খরচ হয়েছে ৬৮.৩৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২.৪৪% বেশি।অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধির এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক মুদ্রা বাজার আরও স্থিতিশীল হবে।
বিশ্লেষণবাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপের ফলে—রিজার্ভ শক্তিশালী হচ্ছে, যা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ও আমদানি ব্যয় মেটাতে সহায়ক।ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকছে, ফলে বাজারে অনিশ্চয়তা কমছে।আইএমএফের শর্ত পূরণ হওয়ায় ভবিষ্যতে আরও ঋণ সহায়তা পেতে সুবিধা হবে।তবে কিছু ঝুঁকিও রয়ে গেছে—বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা বা জ্বালানি দামের অস্থিরতা দেখা দিলে আবারও চাপ বাড়তে পারে।রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ের প্রবাহ কমে গেলে রিজার্ভ ধরে রাখা কঠিন হবে।বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে যে কৌশল নিয়েছে, তা মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণ ও রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ—এই দুই লক্ষ্য অর্জনের জন্য। প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি থাকায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। তবে ডলারের দাম হঠাৎ কমে গেলে তা আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনে মূল্য স্থিতিশীল রাখছে।[41]এটি একদিকে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলেও আস্থা তৈরি করছে।