ডাকসু নির্বাচন ২০২৫: ৮টি উদ্যোগে আলোচনায় নতুন নেতৃত্ব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)
নির্বাচন, যা কেবল ছাত্র রাজনীতির নয়, জাতীয় আলোচনারও কেন্দ্রবিন্দু। ২০২৫ সালের
নির্বাচনের পর নবীন নেতৃত্ব যেভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে, তা ক্যাম্পাসজুড়ে
নতুন আশার সঞ্চার করেছে।এবারের নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’
২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে জয়লাভ করে চমক সৃষ্টি করে। নেতৃত্বের ভার হাতে নিয়েই নতুন
ভিপি সাদিক কায়েম এবং জিএস এস এম ফরহাদের দল প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে মানবিক ও
শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচিতে মনোনিবেশ করেছে।নির্বাচনী ডামাডোল থামার পরপরই এই নবনির্বাচিত নেতারা যে আটটি ইতিবাচক
উদ্যোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং ক্যাম্পাসে আস্থা তৈরি
করেছেন, তা বিশ্লেষণ করা হলো:১. ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি
শ্রদ্ধা প্রদর্শননির্বাচনে জয়লাভের পর মুহূর্তেই নেতা-কর্মীরা নিজেদের দায়িত্বের প্রতি
ঐতিহাসিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ফলাফল ঘোষণার পরদিনই নবনির্বাচিত নেতারা
রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে গিয়ে দোয়া-মোনাজাত করেন। একই সঙ্গে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নবাব স্যার সলিমুল্লাহর কবরেও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এই উদ্যোগ একদিকে যেমন ঐতিহাসিক মূল্যবোধকে ধারণ করে, তেমনই নতুন নেতৃত্বকে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চেতনার সঙ্গে যুক্ত করে।২. সাবেক নেতাদের প্রতি
সৌজন্য ও মানবিকতানতুন নেতৃত্ব প্রতিহিংসার রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে রেখে সৌজন্যের এক উজ্জ্বল
দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ডাকসুর নবনির্বাচিত প্রতিনিধি দল সাবেক ভিপি নুরুল হক
নুরের অসুস্থতার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান এবং তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন।
এছাড়া, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি এবং সাবেক ডাকসু নেতা মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গেও
সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তাঁরা। এই পদক্ষেপ ছাত্র রাজনীতির পুরনো দ্বন্দ্বকে অতিক্রম
করে এক নতুন সংস্কৃতি তৈরির বার্তা দেয়।৩. প্রয়াত সাংবাদিকের
পরিবারের পাশে মানবিক সহযোগিতাডাকসু নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহ করার সময় নিহত সাংবাদিক তরিকুল শিবলীর
পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন নেতৃত্ব তাদের মানবিক দিকটি তুলে ধরে। ইসলামী
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম নিজে উপস্থিত থেকে শিবলীর পরিবারের
হাতে দুই লাখ টাকা তুলে দেন এবং জানান, শিবলীর সন্তানদের শিক্ষাজীবনে সকল প্রকার
সহায়তা দেওয়া হবে। একটি ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে এমন তাৎক্ষণিক ও বড় আকারের আর্থিক
ও নৈতিক সহযোগিতা শিক্ষার্থীদের মনে গভীর রেখাপাত করেছে।৪. প্রথম কার্যকর
কার্যনির্বাহী সভা ও সিনেটে প্রতিনিধি মনোনয়নদায়িত্ব গ্রহণের পরই নবনির্বাচিত নেতারা ১৪ সেপ্টেম্বর ডাকসুর প্রথম
কার্যনির্বাহী সভায় মিলিত হন। উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের সভাপতিত্বে
অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিনেটের জন্য পাঁচজন ছাত্র
প্রতিনিধি মনোনয়ন দেওয়া হয়। দ্রুততম সময়ে এই সভা আহ্বান প্রশাসনের সঙ্গে
শিক্ষার্থীদের কার্যকর অংশগ্রহণের পথ সুগম করেছে।৫. আহত শিক্ষার্থীর প্রতি
সংবেদনশীলতাশিক্ষার্থীদের যেকোনো সংকটে পাশে থাকার যে প্রতিশ্রুতি নতুন নেতৃত্ব
দিয়েছে, তার প্রমাণ মেলে আহত শিক্ষার্থী সাখাওয়াত সরকারের ঘটনায়। মুহসীন হলের এই
শিক্ষার্থী আহত হলে ডাকসু নেতারা দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে তাঁর খোঁজখবর নেন এবং
চিকিৎসার বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এটি প্রমাণ করে, নেতৃত্ব এখন কেবল
প্রশাসনিক চেয়ারে বসে নেই, শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সমস্যার প্রতিও তাদের নজর
রয়েছে।৬. মৃত শিক্ষার্থীর জানাজায়
অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের উদ্যোগঅমর একুশে হলের মেধাবী ছাত্র নাফিস খন্দকারের অকাল মৃত্যুতে ডাকসু নেতারা
জানাজায় অংশ নেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। এই ঘটনার
প্রেক্ষিতেই তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রক্টরিয়াল বডির
সঙ্গে তাৎক্ষণিক মতবিনিময় করেন। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রুটিন আলোচনার
বাইরে গিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার এই মানসিকতা শিক্ষার্থীদের আস্থা বাড়িয়েছে।৭. প্রযুক্তিনির্ভর ‘আমাদের
লাল বাস’ অ্যাপ চালুছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহর উদ্যোগে যে উদ্যোগটি সবচেয়ে বেশি
ইতিবাচক আলোচনা সৃষ্টি করেছে, তা হলো—‘আমাদের লাল বাস’ শীর্ষক লাইভ ট্র্যাকিং
অ্যাপ চালু। ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে চালু হওয়া এই অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এখন
তাদের ক্যাম্পাসের বাস রুটের অবস্থান (Live Tracking) সহজেই ট্র্যাক করতে পারছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় ক্যাম্পাসে পরিবহন সমস্যা কমাতে এবং সময় বাঁচাতে
প্রযুক্তির এমন ব্যবহার অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছে।৮. সুশৃঙ্খল ক্যাম্পাস সেবা
ও নিরাপত্তা পরিকল্পনাদায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ডাকসু নেতারা দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক সংস্কারের
দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন সমস্যার সমাধান, দ্রুত
শাটল সার্ভিস চালু, ক্যাম্পাসের যানজট কমাতে রিকশা নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক
নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা শুরু করেছেন তাঁরা।
এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারছে যে, নতুন নেতৃত্ব কেবল তাৎক্ষণিক নয়, বরং
স্থিতিশীল সমাধানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।আস্থা ও প্রত্যাশার নতুন
দিগন্তডাকসুর নবনির্বাচিত নেতৃত্ব কেবল একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনী জয়কে উদযাপন করেই
থেমে থাকেনি; তারা দ্রুত, মানবিক ও টেকসই কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেদের কর্মদক্ষতার
প্রমাণ দিয়েছে। তাদের উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে যে, ছাত্র রাজনীতি এখন কেবল স্লোগান
বা মিছিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সেবা, মানবিকতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক
সংস্কারের মাধ্যম হতে পারে।
এই ইতিবাচক শুরু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন নেতৃত্বের
প্রতি আস্থা তৈরি করেছে এবং একইসঙ্গে তাদের প্রত্যাশার পারদকেও অনেক উঁচুতে নিয়ে
গেছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন নেতৃত্ব তাদের এই গতিশীলতা ও কার্যকর উদ্যোগগুলো কতদূর
ধরে রাখতে পারে।