শীতকালে বিয়ে কেন এত জনপ্রিয় জানুন শীতকালে বিয়ের নানা সুবিধা
বাংলাদেশে শীতকালে বিয়ে মানেই উৎসবের ঋতু। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টিই বিয়ের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত মৌসুম। গ্রাম হোক বা শহর, সবখানে বাজে বিয়ের সানাই, ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের রঙ। এই সময় আবহাওয়া থাকে আরামদায়ক, আকাশ থাকে পরিষ্কার, আর চারদিকে উৎসবের আমেজ।আবহাওয়ার স্বস্তি ছাড়াও আছে বাস্তব অনেক কারণ, যেমন লম্বা ছুটি, আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতি, খাবারের মান বজায় রাখা, সাজগোজের সুবিধা, এমনকি বিদ্যুৎ ও খরচ সাশ্রয়। তাই প্রতি বছরই শীতকালে দেশের প্রায় ৭০% বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
১. আরামদায়ক আবহাওয়া, ক্লান্তিহীন আয়োজনগরমে সামান্য পরিশ্রমেও ঘাম আর ক্লান্তি পেয়ে বসে, কিন্তু শীতকালীন বিয়ে মানেই আরামদায়ক কাজের পরিবেশ। বিয়ের সাজসজ্জা থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন, সব কিছুই সহজ হয়ে যায়। বর ও কনে দুজনেই আরামবোধ করেন, মুখে ক্লান্তি আসে না, ছবি তোলাও হয় সুন্দর।শীতকালের মৃদু ঠান্ডায় কাজের মানুষ থেকে আত্মীয়-স্বজন, সবাই প্রাণবন্তভাবে বিয়ের প্রস্তুতি নিতে পারেন। ফলে আয়োজন হয় আরও জাঁকজমকপূর্ণ।
২. বছরের শেষ ও শুরুর সময়,নতুন জীবনের প্রতীকবছরের শেষ মানেই নতুন সূচনার সময়। অনেকেই ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে বিয়ে করতে চান, যাতে নতুন বছরে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।অনেকে বিশ্বাস করেন, শীতকালে বিয়ে করলে জীবনেও আসে স্থিরতা ও সৌভাগ্য। আবার অনেক পরিবার বছরের বাজেট হিসেবেও এই সময় বিয়ে আয়োজনকে উপযুক্ত মনে করেন।
৩. লম্বা ছুটি ও আত্মীয়-সমাগমডিসেম্বর মাসে স্কুল-কলেজের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়, অফিসে কাজের চাপ কমে। এই সময়ে আত্মীয়স্বজনদের ছুটি মেলে, ফলে দূর-দূরান্তে থাকা সবাই বিয়েতে যোগ দিতে পারেন।এ কারণেই বিয়ের মৌসুম বাংলাদেশে সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকে।এই পারিবারিক একত্রতা বিয়েকে শুধু অনুষ্ঠান নয়, এক মিলনমেলায় পরিণত করে।
৪. সাজগোজে কোনো ঝামেলা নেইগরমের দিনে মেকআপ দীর্ঘ সময় ধরে টিকে না, ঘামে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু শীতকালে বিয়ে মানেই সাজের রাজত্ব! কনে আর অতিথিরা ভারী মেকআপ, লেহেঙ্গা, শাড়ি, সবকিছুতেই থাকেন নিশ্চিন্ত। সাজে ঘাম জমে না, মেকআপ টেকে দীর্ঘক্ষণ। তাই অনেক কনে ইচ্ছাকৃতভাবে শীতকাল বেছে নেন বিয়ের জন্য, কারণ এই সময় বউ সাজার আনন্দটা দ্বিগুণ হয়।
৫. খাবার পরিবেশনে সুবিধাশীতকালে খাবার সংরক্ষণে ঝামেলা থাকে না। পোলাও, বিরিয়ানি, কোরমা, রোস্ট, রেজালা, পায়েস, সবই দীর্ঘ সময় সতেজ থাকে। এছাড়া শীতকালের ঐতিহ্যবাহী খাবার যেমন পিঠা-পুলি বা গরম চা, অতিথিদের আনন্দ দ্বিগুণ করে তোলে। ভারী খাবারও হজমে সমস্যা হয় না, তাই শীতকালে বিয়ের আয়োজন খাবারের দিক থেকেও সবচেয়ে উপযুক্ত।
৬. ফুলসজ্জার মৌসুমশীত মানেই ফুলের মৌসুম। গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, অর্কিড, বেলি, সবই পাওয়া যায় সহজে এবং সাশ্রয়ী দামে। বিয়ের মঞ্চ, গেট, কনের গহনা, গায়ে হলুদের সাজ, সব জায়গায় ফুলের ব্যবহার হয়। ফলে ডেকোরেশনও হয়ে ওঠে দৃষ্টিনন্দন।
৭. সময় ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়শীতকালে দিন ছোট, রাত বড়। তাই অনুষ্ঠান সাধারণত বিকেলেই শুরু হয় এবং রাতে দ্রুত শেষ হয়। ফ্যান বা এসির প্রয়োজন না থাকায় বিদ্যুৎ খরচও কমে যায়। অনেক পরিবার তাই শীতকালকে বিয়ের সাশ্রয়ী মৌসুম হিসেবে ধরে নেয়।
৮. মশা নেই, আরামদায়ক রাতগরমে মশার উপদ্রব বিয়ের অনুষ্ঠান নষ্ট করতে পারে। কিন্তু শীতে মশা তুলনামূলক কম থাকে, ফলে অতিথিরা নিশ্চিন্তে সময় কাটাতে পারেন। নবদম্পতির প্রথম রাতও হয় নির্ভার ও আরামদায়ক।
৯. হানিমুনের আদর্শ সময়বিয়ের পর ঘুরতে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হলো শীতকাল। কক্সবাজার, সাজেক, সিলেট কিংবা দার্জিলিং, সব জায়গাতেই আবহাওয়া থাকে মনোরম। পর্যটনকেন্দ্রগুলোও শীতকালে নানা হানিমুন অফার দেয়, ফলে দম্পতিরা উপভোগ করতে পারেন রোমান্টিক সময় কাটানো।
১০. শীতের উৎসব ও সামাজিক প্রেক্ষাপটশীতকালে ধান কাটা হয়, ঘরে ওঠে নতুন চাল। তখন চলে পিঠা-পায়েসের উৎসব। ফলে মানুষের মনও থাকে উজ্জ্বল ও উৎসবমুখর।এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে শীতকালে বিয়ে হয়ে ওঠে আনন্দ, মিলন ও ঐতিহ্যের প্রতীক।
শীতকালের বিয়ে মানেই রঙিন উৎসবের সময়সব দিক বিবেচনায় দেখা যায়, শীতকালের বিয়ে কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি সংস্কৃতি। স্বস্তিদায়ক আবহাওয়া, সাশ্রয়ী খরচ, সাজগোজের সুবিধা, অতিথি আপ্যায়নের আনন্দ এবং নবদম্পতির হানিমুনের রোমাঞ্চ, সব মিলে শীতকালই বিয়ের আদর্শ সময়। তাই প্রতি বছর শীত এলেই দেশজুড়ে বিয়ের সানাই বাজে, মুখে হাসি ফোটে নবদম্পতি থেকে অতিথি,সকলের।[938]