সিরাজগঞ্জে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের হত্যা, গুম ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সিরাজগঞ্জ জেলা এক বিভীষিকাময় অধ্যায়ের সাক্ষী। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা ভয়াবহ নির্যাতন, হত্যা, গুম ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন। দলীয় সূত্র, নিহতদের পরিবার এবংভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক অমানবিক নিপীড়নের চিত্র।হত্যাকাণ্ড ও গুমের শিকার নেতাকর্মীরাসিরাজগঞ্জে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বিএনপির অন্তত ৩২ জন ও জামায়াতের ১৩ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গুমের পর হত্যা করা হয়েছে যুবদলের অন্তত তিনজন নেতাকে।
পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন অন্তত তিনজন।
চোখ হারিয়েছেন ১০ জন নেতাকর্মী, যাদের অনেকেই আজ মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপি সভাপতি রোমানা মাহমুদ গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিলেন।
সবচেয়ে নৃশংস হত্যার মধ্যে অন্যতম ছিল সয়দাবাদ ইউনিয়নের যুবদল নেতা জবান আলী হত্যাকাণ্ড। ২০১৪ সালে চাঁদার টাকা না দেওয়ায় তাকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। একইভাবে গুম করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা বাবলু ও জাহাঙ্গীর হোসেনকে।পরিবারগুলোর কান্না ও ক্ষোভনিহতদের পরিবার এখনো সেই ভয়াল স্মৃতি ভুলতে পারেনি। জবান আলীর ভাই অভিযোগ করেন, “২০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোটি টাকার সম্পদ লুট হয়েছে।”অন্যদিকে নিহত বাবলুর মা ভানু খাতুন বলেন, “আমার ছেলে তাঁতের কাজ করে সংসার চালাত। বিএনপি করার কারণে তাকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। আগুনে আমাদের ঘরবাড়ি সব পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আমি হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।”আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের ভূমিকাবিএনপি নেতাদের অভিযোগ, সিরাজগঞ্জে নির্যাতনে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন সদর আসনের সাবেক এমপি হাবিবে মিল্লাত মুন্না, যিনি শেখ হাসিনার আত্মীয়। তার সহযোগিতায় সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন ও পৌর সভাপতি হেলাল উদ্দিন বিরোধী দলের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়ন চালিয়েছেন।এছাড়া তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ছাত্রশিবিরের দুই কর্মীকে হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিলেন। মামলা হলেও পুলিশ ও আদালত আওয়ামী নেতাদের রক্ষা করেছে।মামলার পাহাড় ও সাজানো অভিযোগহাসিনার শাসনামলে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ছিল সাত শতাধিক মিথ্যা মামলা।
প্রায় ১০ লাখ নেতাকর্মী এসব মামলার আসামি হন।
অনেককে সাজানো ডাকাতি, বিস্ফোরক ও হত্যার মামলায় ফাঁসানো হয়।
অন্তত ৩০ জন নেতাকর্মী যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ সুইটসহ সাতজনকে রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন, যা বিএনপির মতে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।বিএনপি-জামায়াত নেতাদের বক্তব্যজেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন,
“আমাদের ওপর স্টিমরোলার চালানো হয়েছিল। প্রায় ৪০ জন নেতাকর্মী গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, শতাধিক পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। প্রতিদিনই মামলা, হামলা আর কারাবাস ছিল আমাদের নিয়তি।”অন্যদিকে জামায়াত নেতারা জানান, শুধু সিরাজগঞ্জেই তাদের বিরুদ্ধে ৩৫০টির বেশি মামলা দেওয়া হয়েছে। আটক ও নির্যাতনের ঘটনা ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। অনেককে মুক্তি দেওয়ার পরপরই আবার গ্রেপ্তার করা হতো।জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে সিরাজগঞ্জে জামায়াতের অন্তত ১৩ জন কর্মী নিহত হয়েছেন।
মুক্তার হোসেন ও রুহুল আমিনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ইউনুস আলী ও ফরিদুল ইসলামকে হত্যা করা হয় পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার অজুহাতে।
গুমের শিকার হন অধ্যাপক শহিদুল ইসলামসহ একাধিক নেতা।
সিরাজগঞ্জে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন, হত্যা, গুম ও মিথ্যা মামলার যে বিভীষিকাময় ইতিহাস তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক অন্ধকার অধ্যায়। ভুক্তভোগীরা আজও বিচার ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছেন।