প্রেসিডেন্ট নেলসন
গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সাথে আমরা দ্য চার্চ অফ জেসাস ক্রাইস্ট অফ ল্যাটার-ডে
সেন্টস-এর অন্যতম প্রধান নেতা, প্রেসিডেন্ট নেলসন (প্রেসিডেন্ট রাসেল এম. নেলসন) এর চলে যাওয়ার
খবর জানাচ্ছি। ১০১ বছর বয়সে, গির্জার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘজীবী এবং বয়স্ক
সভাপতি হিসেবে তিনি তার নশ্বর জীবনের ইতি টেনেছেন। সল্ট লেক সিটিতে নিজের বাড়িতে
শান্তিপূর্ণভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন এই মহান সাধক। প্রেসিডেন্ট নেলসন শুধু একজন ধর্মীয় নেতা
ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী সংস্কারক, একজন অনুকরণীয় চিকিৎসক এবং
বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।একটি অসাধারণ জীবন, সেবার এক দীর্ঘ পথরাসেল এম.
নেলসন এর জীবন ছিল সেবা, জ্ঞান এবং অটুট বিশ্বাসের এক
উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তরুণ বয়সে তিনি কোরিয়ান যুদ্ধে সেনাবাহিনীর মেডিকেল অফিসার
হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তার প্রাথমিক সেবার শুরু। চিকিৎসা ক্ষেত্রে তার
অবদান ছিল অসাধারণ। তিনি একজন প্রখ্যাত হার্ট সার্জন হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি
লাভ করেন এবং ওপেন-হার্ট সার্জারির মতো জটিল বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ও উদ্ভাবন
করেন। এই কিংবদন্তি চিকিৎসক অসংখ্য জীবন বাঁচিয়েছেন এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের
অগ্রগতিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন।১৯৮৪ সালে, চিকিৎসা পেশার শীর্ষে থাকা অবস্থায়, প্রেসিডেন্ট নেলসন বারো প্রেরিতদের কোরামে
(কোয়ারাম অফ
দ্যা টুয়েলফ অ্যাপোস্টলস) যোগদানের জন্য আহ্বান পান। এই কোরাম গির্জার
সর্বোচ্চ নেতৃত্ব প্রদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি। প্রায় চার দশক ধরে তিনি
গির্জার সর্বোচ্চ নেতৃত্বে ছিলেন, যেখানে তার প্রজ্ঞা, অন্তর্দৃষ্টি এবং
আধ্যাত্মিক নির্দেশনা গির্জাকে বহু পথ চালিত করেছে। তার এই যাত্রা ছিল সেবা, ত্যাগ
এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অবিস্মরণীয় গল্প।নেতৃত্বের শীর্ষে: এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন২০১৮ সালে তাঁর পূর্বসূরি টমাস এস. মনসনের মৃত্যুর পর, প্রেসিডেন্ট নেলসন দ্য চার্চ অফ জেসাস ক্রাইস্ট
অফ ল্যাটার-ডে সেন্টস-এর সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। এই দায়িত্ব গ্রহণের সময়
তার বয়স ছিল ৯৩ বছর, যা তাকে গির্জার ইতিহাসে অন্যতম বয়স্ক সভাপতি হিসেবে
চিহ্নিত করে। তবে তার বয়স ছিল কেবল একটি সংখ্যা; তারুণ্যদীপ্ত উৎসাহ এবং ভিশন
নিয়ে তিনি গির্জাকে এক নতুন যুগে প্রবেশ করান। ২০২৪ সালে তিনি শতবর্ষ পেরিয়ে প্রথম
সভাপতি হিসেবে ইতিহাস গড়েন, যা তার অসাধারণ স্বাস্থ্য ও ঈশ্বরের উপর তার গভীর
আস্থার প্রতিফলন।স্মরণীয় সংস্কার ও বৈশ্বিক প্রভাবপ্রেসিডেন্ট নেলসন এর নেতৃত্বে গির্জায় বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন
আনা হয়, যা গির্জার চরিত্র ও বৈশ্বিক প্রসারের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। তার সবচেয়ে
উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একটি ছিল "মরমন" শব্দটির পরিবর্তে
গির্জার পূর্ণ নাম — "দ্য চার্চ অফ জেসাস ক্রাইস্ট অফ ল্যাটার-ডে
সেন্টস" — ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, গির্জার পূর্ণ
নামই যীশু খ্রীষ্টকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রাখে এবং এটি আমাদের বিশ্বাস ও উপাসনার
মূল ভিত্তি। এই পদক্ষেপ গির্জার ব্র্যান্ডিংয়ে একটি বড় পরিবর্তন আনে এবং এর
প্রকৃত পরিচয়কে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরতে সাহায্য করে।তার সময়েই গির্জা অভূতপূর্ব হারে নতুন মন্দির নির্মাণের প্রকল্প চালু করে।
তার লক্ষ্য ছিল বিশ্বের প্রতিটি কোণে যেখানে গির্জার সদস্য সংখ্যা বাড়ছে, সেখানে
সদস্যদের জন্য মন্দির সুবিধা নিশ্চিত করা। তার ছয় বছরের প্রেসিডেন্সিতে মন্দিরের
সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়, যা বিশ্বাসীদের জন্য আধ্যাত্মিক বৃদ্ধি এবং ঈশ্বরের
সাথে পবিত্র চুক্তিতে প্রবেশ করার সুযোগ করে দেয়। এই মন্দিরের ব্যাপক প্রসার প্রেসিডেন্ট নেলসন এর বৈশ্বিক ভিশনের একটি
উজ্জ্বল উদাহরণ।নেতৃত্বের ক্ষেত্রে, প্রেসিডেন্ট নেলসন ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী কিন্তু একই সাথে দৃঢ়
ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি আধ্যাত্মিক নীতিগুলোর প্রতি অটুট বিশ্বাস রাখতেন এবং
সেগুলোকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতেন। এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের প্রতি গির্জার নীতিতে কিছু
পরিবর্তন আনা হলেও, তিনি গির্জার মূল অবস্থান অটুট রেখেছিলেন, যা তার নেতৃত্বের
ভারসাম্যপূর্ণ প্রকৃতি প্রমাণ করে।কোভিড-১৯ মহামারীর কঠিন সময়ে, প্রেসিডেন্ট নেলসন ছিলেন আশার আলো। তিনি শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা
দেননি, বরং বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বানও জানিয়েছিলেন। তিনি টিকা গ্রহণ
এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা তার সদস্যদের শারীরিক ও
আধ্যাত্মিক উভয় কল্যাণের প্রতি তার উদ্বেগের প্রতিফলন। তার এই সমন্বিত
দৃষ্টিভঙ্গি অসংখ্য জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছে এবং বিশ্বব্যাপী গির্জার সদস্যদের
জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেছে।ব্যক্তিগত জীবন ও উত্তরাধিকাররাসেল এম.
নেলসন এর ব্যক্তিগত জীবন ছিল মেধা ও ভালোবাসার এক অনন্য
মিশ্রণ। একজন সফল চিকিৎসক ও গবেষক হিসেবে তিনি শুধু পেশাগত জীবনেই নয়, পারিবারিক
জীবনেও ছিলেন একজন সফল মানুষ। তার প্রথম স্ত্রী ড্যান্টজেল, যার সাথে তার ১০টি
সন্তান ছিল, ২০০৫ সালে মারা যান। পরবর্তীতে তিনি ওয়েন্ডি ওয়াটসন নেলসনকে বিয়ে
করেন, যিনি তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার পাশে ছিলেন। তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী
ওয়েন্ডি এবং তার দশ সন্তানের মধ্যে আটজনকে রেখে গেছেন।
প্রেসিডেন্ট নেলসন এর উত্তরাধিকার শুধুমাত্র তার সাংগঠনিক পরিবর্তন বা
নীতিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার উত্তরাধিকার নিহিত আছে তার অটুট
বিশ্বাস, তার অদম্য সেবা, তার বিনয়ী আত্মা এবং তার দূরদর্শী ভিশনের মধ্যে। তিনি
দেখিয়েছেন যে, বিশ্বাস এবং বিজ্ঞান একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, এবং একজন মানুষ
তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারে।ভবিষ্যতের পথগির্জার
নিয়ম অনুসারে, তার উত্তরসূরি হিসেবে ডালিন এইচ. ওকস (ড্যালিন এইচ. ওকস) সভাপতি পদে দায়িত্ব নিতে পারেন
বলে আশা করা হচ্ছে। এই কঠিন সময়ে গির্জার সদস্যরা প্রেসিডেন্ট নেলসন এর
দেখানো পথে এগিয়ে যাবে এবং তার উত্তরাধিকারকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।
প্রেসিডেন্ট নেলসন ছিলেন শুধু একজন নেতা নন, বরং একজন দূরদর্শী
সংস্কারক, একজন নিরাময়কারী এবং একজন অনুপ্রেরণামূলক ব্যক্তিত্ব হিসেবে
বিশ্বব্যাপী স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার জীবন ছিল সেবা, বিশ্বাস এবং ভালোবাসার এক দীর্ঘ
মহাকাব্য। তিনি তার জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, যখন একজন মানুষ ঈশ্বরের ইচ্ছার
কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, তখন তার মাধ্যমে কত বড় কাজ সম্পন্ন হতে পারে। তার
প্রয়াণ বিশ্বব্যাপী ল্যাটার-ডে সেন্টস এবং তাদের অনুসারীদের জন্য এক অপূরণীয়
ক্ষতি, কিন্তু তার জীবন ও শিক্ষার আলো চিরকাল আমাদের পথ দেখাবে। প্রেসিডেন্ট নেলসন এর আত্মা শান্তিতে বিশ্রাম
নিক।[42][83][326][330][331]