হিলি দিয়ে এক লাখ টনের বেশি চাল আমদানি, বাজারে স্বস্তি
সাম্প্রতিক
সময়ে দেশের চালের বাজার যখন কিছুটা অস্থির ছিল, ঠিক তখনই আশার আলো দেখিয়েছে
দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর। মাত্র ৩৮ দিনের ব্যবধানে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে
রেকর্ড ১ লাখ ২০ হাজার টনেরও বেশি চাল, যা দেশের বাজারে এনেছে উল্লেখযোগ্য
স্বস্তি। ফলস্বরূপ, সব ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি ৩ থেকে ৪ টাকা কমেছে, যা সাধারণ
ভোক্তা ও নিম্ন আয়ের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।চালের দাম
নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং আমদানির অনুমতি পাওয়ার পর গত ১২
আগস্ট থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পুরোদমে চাল আমদানি শুরু হয়। শুল্কমুক্তভাবে চালের
এই বিপুল প্রবাহ বাজারের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যা দ্রুতই দৃশ্যমান হয়েছে
খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে।বন্দরে সারি সারি ট্রাকশুক্রবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে হিলি স্থলবন্দরের চিত্র ছিল চোখে পড়ার মতো।
বন্দরের ভেতরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ভারতীয় চালবোঝাই শত শত ট্রাক, যেন এক
বিশাল চালের মেলা। স্বর্ণা-৫, সম্পা কাটারি, ৪০/৯৪ (চিকন চাল) এবং রত্না জাতের মতো
বিভিন্ন ধরনের চালের বস্তা নামছে প্রতিটি ট্রাক থেকে। দেশের বিভিন্ন
প্রান্ত থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীরা যাচাই-বাছাই করে তাদের প্রয়োজনীয় চাল সংগ্রহ করছেন। এটি
কেবল একটি বাণিজ্যিক দৃশ্য নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় হিলি বন্দরের
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।বর্তমান বাজারদর: কমেছে ৩-৪ টাকাহিলি বন্দর
থেকে আসা চালের কারণে বাজারে সব ধরনের চালে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত দাম কমেছে।
বর্তমানে, বিভিন্ন জাতের চালের কেজিপ্রতি দর নিম্নরূপ: স্বর্ণা-৫: ৪৯–৫০ টাকাসম্পা কাটারি: ৬৫–৬৭ টাকা৪০/৯৪ জাত: ৫৮–৬০ টাকা
গত কয়েক মাসের
তুলনায় এই মূল্যহ্রাস নিঃসন্দেহে ভোক্তাদের জন্য এক দারুণ খবর, যা তাদের দৈনন্দিন
জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা হলেও লাঘব করছে।আমদানি পরিসংখ্যানহিলি
কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ আগস্ট থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (৩৮ দিনে) মোট ২
হাজার ৩২৩টি ট্রাকে চাল খালাস হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ চাল দেশের চাহিদা মেটাতে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমদানিকারকরা প্রতি টন চাল ৫০০ থেকে ৫২০ ডলার দরে
আমদানি করছেন এবং মাত্র ২% অগ্রিম আয়কর পরিশোধ করছেন, যা আমদানি প্রক্রিয়াকে আরও
সহজ ও সাশ্রয়ী করেছে।ব্যবসায়ীদের মতামতস্থানীয়
ব্যবসায়ীরা এই আমদানিকে স্বাগত জানালেও, চাহিদা-সরবরাহের ভারসাম্য নিয়ে তাদের
মধ্যে কিছুটা উদ্বেগও রয়েছে। ব্যবসায়ী নূর ইসলাম জানান, "আমদানি অব্যাহত
থাকলেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি হওয়ায় অনেক চাল এখনো বিক্রি হয়নি। তবে বাজারে
চাহিদা বাড়লে সহজেই বিক্রি হয়ে যাবে।"আরেক ব্যবসায়ী
মমিনুর বলেন, "আমরা চাল কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাই। বাজার স্থিতিশীল
থাকলে আমাদের ব্যবসা ভালো চলে, নইলে লোকসান গুনতে হয়।" তাদের এই মন্তব্য
বর্তমান পরিস্থিতির একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে, যেখানে ভোক্তারা উপকৃত হলেও
ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতের বাজারের গতিবিধি নিয়ে সতর্ক রয়েছেন।প্রশাসনের মন্তব্যহিলি
কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন নিশ্চিত করেছেন যে, দেশের
বাজারে চালের চাহিদা থাকায় ভারত থেকে আমদানি প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। তিনি
আরও জানান, "আমদানিকারকেরা যেন দ্রুত এবং নির্বিঘ্নে চাল বাজারজাত করতে
পারেন, সেজন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করছে।" প্রশাসনের
এই সক্রিয় ভূমিকা আমদানিকৃত চাল দ্রুত ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করছে।স্বস্তি এলেও চ্যালেঞ্জ বিদ্যমানমাত্র ৩৮ দিনে লাখ টনের বেশি চালের এই আমদানির ফলে দেশের চালের বাজারে যে
স্বস্তি ফিরে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। দাম কমে সাধারণ মানুষের মুখে
হাসি ফোঁটালেও, ব্যবসায়ীদের সামনে এখন চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায়
রাখার চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তবে আশা করা যায়, সরকারের সঠিক নীতি ও আমদানিকারকদের
প্রচেষ্টায় দেশের চালের বাজার ভবিষ্যতে আরও স্থিতিশীল থাকবে এবং সাধারণ মানুষ
নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যে চাল পাবে। হিলি স্থলবন্দরের এই সাফল্য দেশের খাদ্য
নিরাপত্তায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।