ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় ও জাতিগত হিংসার পাশাপাশি নতুন করে জাতিগত বিদ্বেষমূলক সহিংসতা বাড়ছে কি না সে প্রশ্ন আবার সামনে এলো উত্তরাখণ্ডের রাজধানী দেরাদুনে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনায়। ‘চীনা’ সন্দেহে ত্রিপুরার এক ছাত্রকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।নিহত ছাত্রের নাম অ্যাঞ্জেল চাকমা। তিনি ভারতের ত্রিপুরার ঊনকোটি জেলার বাসিন্দা এবং দেরাদুনের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। গত ৯ ডিসেম্বর, অ্যাঞ্জেল তাঁর ছোট ভাই মাইকেলের সঙ্গে দেরাদুনের একটি বাজারে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে যান। অভিযোগ, সেখানেই স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাঁদের ‘চীনা’ ও ‘মোমো’ বলে কটূক্তি শুরু করে।অভিযোগ অনুযায়ী, অ্যাঞ্জেল শান্তভাবেই জানান যে তাঁরা পুরোপুরি ভারতীয় এবং ত্রিপুরার বাসিন্দা। পরিচয়ের প্রমাণ দিতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তাঁকে মাথা ও পিঠে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা ১৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তাঁর মৃত্যু হয়।অ্যাঞ্জেলের মৃত্যুর খবর পৌঁছাতেই ত্রিপুরাজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মরদেহ আগরতলায় পৌঁছানোর পর সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখান এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তিনি জানান, দোষীদের গ্রেপ্তার করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী।উত্তরাখণ্ড পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একজন অভিযুক্ত নেপালে পালিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাকে ধরতে পুলিশের একটি বিশেষ দল নেপালে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।এই হত্যাকাণ্ডের জেরে উত্তর–পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা এবং তিপ্রা মথা পার্টির নেতা প্রদ্যোৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মা প্রকাশ্যে ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, উত্তর–পূর্বাঞ্চলের মানুষও ভারতের অন্যান্য নাগরিকদের মতোই সমান অধিকারসম্পন্ন, এবং এই হামলা কোনো ব্যক্তির ওপর নয় গোটা অঞ্চলের মানুষের ওপর আঘাত।বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে ঘৃণা অপরাধের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বাংলাদেশি সন্দেহে পরিযায়ী শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা, চোর সন্দেহে গণপিটুনি, এসব ঘটনার তালিকায় এবার যুক্ত হলো ‘চীনা’ সন্দেহে এক ছাত্রকে হত্যা করার অভিযোগ। রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রশ্ন, এই সহিংসতা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি গভীর সামাজিক সমস্যার প্রতিফলন?[1276]এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, পরিচয়ের ভুল ধারণা ও বিদ্বেষ কীভাবে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ভারতে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অ্যাঞ্জেল চাকমার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়, এটি ভারতের সামাজিক সহনশীলতা ও মানবিকতার ওপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন।